বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার
ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে পণ্ড হয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্ট। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে কনসার্টে দাওয়াত দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগে তার সমর্থকরা গত শুক্রবার রাত দুইটার দিকে কনসার্টের মঞ্চ, প্যান্ডেলসহ স্টলগুলোতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনার পর রাতেই নেতাকর্মী নিয়ে ঘটনাস্থলে মহড়া দেয় সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এদিকে, কনসার্ট উপলক্ষে ছাপানো পোস্টারে আয়োজক হিসেবে ছাত্রলীগের সঙ্গে ডাকসুর নাম ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের অপকর্ম ঢাকতে তারা ডাকসুর নাম ব্যবহার করছে; অথচ ডাকসুর কোনো সভায় এ আয়োজন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
জানা যায়, চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ১৩ ও ১৪ এপ্রিল কনসার্টের আয়োজন করে ছাত্রলীগ। কনসার্টে সঙ্গীতশিল্পী জেমস ও মিলা এবং ওয়ারফেজ, আর্টসেল, ফিডব্যাকসহ বেশ কয়েকটি ব্যান্ডের গান পরিবেশনের কথা ছিল।
এই কনসার্টকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুটি পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে কোন্দল দেখা দেয়। শোভনের সমর্থকরা অভিযোগ করে, সংগঠনের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও এ আয়োজন সম্পর্কে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। এর ফলে শুক্রবার রাতে কনসার্টস্থলে হামলা ও ভাঙচুর করে তার সমর্থকরা।
শোভনের অনুসারীরাই হামলার সময় ঘটনাস্থলে ছিল বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী নিশ্চিত করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার রাত দুইটার দিকে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আতিকুর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইউসুফ উদ্দীন খান, কবি জসীম উদ্দীন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফ হোসেন, অমর একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এহসান উল্লাহ, মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী ও স্যার এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের নেতৃত্বে মল চত্বরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী।
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরপরই মল চত্বর পরিদর্শন ও নিজেদের সমর্থকদের নিয়ে মহড়া দেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত্ চন্দ্র দাস এবং ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। এসময় ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন উপস্থিত ছিলেন না।
রাত তিনটার দিকে স্যার এ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের সমর্থক সাগর, মেশকাত ও মামুনকে মারধর করা হয়। পরে তাদেরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের দাবি: ডাকসু এজিএস সাদ্দাম হোসেনের সমর্থকরা তাদের মারধর করেছেন। তারা আরো দাবি করেছেন, তাদের মারধর করা ছাড়াও ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন সমর্থক এ এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষার ও জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজার কক্ষে ভাঙচুর করা হয়। যদিও এ ব্যাপারে ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত্ চন্দ্র দাস বলেন, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা হবে। এ ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষতির পরিমাণ ২০-২৫ লাখ টাকা : এদিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কনসার্টের মূল মঞ্চ এলোমেলো ও ভাঙচুরকৃত। পাশে মেলার স্টলগুলো পুড়ে গেছে। কিছু স্টলের তাঁবু উল্টে আছে, বেশ কয়েকটি ফ্রিজ ভেঙে পড়ে আছে। এছাড়া ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়া অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। যার কিছু আগুনে পোড়া।
এ বিষয়ে মোজোর মার্কেটিং বিভাগের অপারেশন হেড (ব্র্যান্ড) আজম বিন তারেক দাবি করেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে তাদের প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মালামালের ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ৩৪টি স্টলের সবকয়টি ভাঙচুর ও ছয়টিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া, ২২টি ফ্রিজের মধ্যে ১৭টি ভাঙচুর করা হয় এবং একটিতে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পুনরায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে সাউন্ড সিস্টেমস নষ্ট হয়ে গেছে।
‘এই কনসার্ট ডাকসুর নয় ছাত্রলীগের’: ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর দাবি করেছেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে যে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে তার আয়োজক ছাত্রলীগ, ডাকসু নয়। এই প্রোগ্রাম নিয়ে ডাকসুতে কোনো আলোচনা হয়নি। ছাত্রলীগের নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে ডাকসুকে ব্যবহার করছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই কনসার্ট উপলক্ষে এক কোটি ২০ লাখ টাকা বাজেট হয়। মোজো কোম্পানিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীপ্রতিষ্ঠান এই কনসার্ট উপলক্ষে টাকা দেয়। ছাত্রলীগের নেতারা এই টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করছে। একপক্ষ আরেকপক্ষকে কোণঠাঁসা করতে প্রচার চালাচ্ছেন এটি ডাকসু ও ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম। অথচ ডাকসুতে এই প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। ডাকসুর সঙ্গে এই বাণিজ্যিক কনসার্টের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।