পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, হাওরবাসীর দুঃখ ঘোচাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেনায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অত্যন্ত শক্তিশালী। আপনারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করলে এই এলাকার হাওর রক্ষা বাঁধ অত্যন্ত মজবুত হবে। মন্ত্রী বলেন, হাওরকে নিয়ে নতুন ধারণা ও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বর্তমান সরকার হাওর ও হাওরবাসীকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। তবে হাওরের সংকট কাটাতে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
গতকাল শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন হাওরের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি সক্রান্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি চলমান হাওর রক্ষা বাঁধের কাজের অগ্রগতির বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের নিকট থেকে অবহিত হন।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ হলরুমে এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহম্মেদ খান, পাউবোর মহাপরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান প্রমুখ।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, হাওর রক্ষায় সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আমাদের উপর ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে। আপনারা দোয়া করুন, যাতে ঘন ঘন বন্যা না হয়। সুনামগঞ্জের হাওরে গত মৌসুমের মতো আর যাতে ফসলহানি না ঘটে সেজন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সব কিছু দিয়েই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই বাঁধের কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, হাওর এলাকার সবাইকে আরো সক্রিয় ভবে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি এখানে এসেছি। আমরা তারই নির্দেশনায় সব সমস্যার সমাধান করবো। নদী-খাল খনন শুরু হয়েছে। হাওরের জন্য সরকারের বিরাট পরিকল্পনা রয়েছে। তাই স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি নিজেদের ফসল নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। যারা পিআইসি কমিটিতে রয়েছেন তাদেরকে দায়িত্বশীলতার সাথে প্রকল্প তৈরির কাজ করতে হবে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সারাদেশসহ হাওরের যে পরিমাণ উন্নয়ন কাজ হচ্ছে অতীতে কোন সরকারই এমনটি করেনি।
এসময় কৃষকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন সাচনাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী এম নবী হোসেন, ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতা এডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু প্রমুখ। তারা হাওরের জলাবদ্ধতা দ্রুত দূর করার কথা উল্লেখ করে বলেন, নতুবা ধান কাটার মৌসুমে ফসল ঘরে তোলা যাবেনা। তারা ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ, নদী ও হাওর খননের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
বজলুল মজিদ খসরু পানিসম্পদ মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আপনি ২১ দিনের মাথায় আবার এসেছেন এই হাওরাঞ্চলে বাঁধের কাজ দেখতে। এটা আপনার আন্তরিকতা ও বদান্যতা। তিনি বলেন, আপনি ঘোষণা দিয়েছেন প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় চলে আসবে সুনামগঞ্জে, এই ঘোষণা আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছে। এবার বাঁধে যে কাজ হচ্ছে তা গত ২০ বছরের মধ্যে আমরা দেখিনি। কাজগুলো দৃশ্যমান। তবে অনেক স্থানে প্রকল্প এলাকায় সাইন বোর্ড টানানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের হাওরের ব্যাপক উন্নয়ন করলে জাতীয় সমৃদ্ধি আসবে।
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, সিলেটস্থ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শহিদুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক, জামালগঞ্জ ডিগ্রী করেজের অধ্যক্ষ মো. হাবিবুর রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু, ‘হাওর বাচাঁও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার দে, মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান প্রমুখ ।
পাগনার হাওর পরিদর্শন:এর আগে পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জামালগঞ্জ উপজেলার বিশাল পাগনা হাওর, হালির হাওর, আপার বৌলাই নদী খননের কাজ হেলিকপ্টারে ঘুরে দেখেন। পরে বীম খালী ইউনিয়নের ভান্ডা-মাখরখলা এলাকার হাওরে অবতরণ করেন। সেখানে তাকে হাজার হাজার কৃষক স্বাগত জানায়। পরে স্থানীয় কৃষক সমাবেশে তিনি কৃষকদের সুখ-দুঃখের কথা শুনেন। এসময় কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা ভান্ডা বিলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের কথা জানালে মন্ত্রী বিষয়টি সুরাহার আশ্বাস দেন।
বৃদ্ধ কৃষকের খুশির কান্না: ভান্ডাবিলের কৃষক সমাবেশে এসেছিলেন আবদুল জব্বার (৬০) । পানিসম্পদ মন্ত্রী বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে ফিরে যাওয়ার সময় বিশাল মাঠের দক্ষিণ পাশে হু হু করে কেঁদে ওঠেন এই বৃদ্ধ কৃষক। স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক কান্নাকাটির কারণ জিগ্যেস করলে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘না বাবা কানছি খুসিতে, মন্ত্রী কইছন ভান্ডাবিলের জমাইল পানি আর থাকবো না, আমরা ধান রইতে (রোপন) পারবো।’ এই বলে তিনি পশ্চিমমুখী হয়ে দুহাত তুলে মোনাজাত করেন।
কিশোরগঞ্জে নদী খননকাজ পরিদর্শন :ময়মনসিংহ প্রতিনিধি শেখ মহিউদ্দিন আহাম্মদ ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি সুবীর বসাক জানান, পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একই দিন কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার বিভিন্ন নদীর খনন কাজ পরিদর্শন করেন। তিনি হেলিকপ্টার লো-ফ্লাই করে ইটনা উপজেলার ধনু নদীর ড্রেজিং কাজ এবং কুলিয়ারচর উপজেলার মেঘনা ও ঘোড়াউত্রা নদীর খনন কাজ পরিদর্শন করেন। পরে বেলা তিনটার দিকে মিঠামইন উপজেলা সদরের হ্যালিপ্যাডে অবতরণ করেন। মন্ত্রী হ্যলিকপ্টার থেকে নামলে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
পরে মিঠামইন উপজেলার নদী খনন কাজের অগ্রগতি নিয়ে জেলা পরিষদ বাংলোয় সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, হাওরসহ দেশের প্রায় সব এলাকার নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। নদীতে পানি এবং এর গতিপ্রবাহ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি এ ব্যাপারে সরকারি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক আজিম উদ্দিন বিশ্বাস, জেলা পরিষয়দ চেয়ারম্যান এডভোকেট জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান, পূর্ব রিজিয়নের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, প্রধান প্রকৌশলী এ এইচ এম ফখরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন খানসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইত্তেফাক/নূহু