বিচারিক আদালতের সাজা স্থগিত চেয়ে আপিল করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। আপিলে জামিন চাওয়া হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ওই আপিলের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে হাইকোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ শুনানির জন্য এই দিন ধার্য করে দেন। এর আগে ৪৪টি আইনগত যুক্তি তুলে ধরে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় গতকাল মলবার এই আপিল দায়ের করা হয়।
আপিল দায়েরের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, দুটি বেঞ্চ আছে দুদকের মামলা শুনানির জন্য। আমরা সিনিয়র বেঞ্চে গিয়েছি। সেই বেঞ্চ আমাদের আপিলের স্লিপ গ্রহণ করেছে। আশা করি আপিল শুনানির জন্য গৃহীত হবে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার আমরা খালেদা জিয়ার জামিন চাইব। আদালত জামিনও দিতে পারে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামিকে দেওয়া সাজার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান। রায়ে বলা হয়, সরকারি এতিম তহবিলের টাকা একে অপরের সহযোগিতায় আত্মসাত্ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। এর মাধ্যমে মামলার সকল আসামির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন। এর ফলে তারা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। আর অর্থনৈতিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে। যার খারাপ প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয়। এ কারণে তাদেরকে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
রায় প্রকাশের পর গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কনফারেন্স কক্ষে সিনিয়র আইনজীবীরা তিন দফায় বৈঠকে মিলিত হন। রুদ্ধদার ওই বৈঠকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এজে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, আব্দুর রেজ্জাক খান, এম মাহবুবউদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, কায়সার কামাল, এম আমিনুল ইসলাম, সগীর হোসেন লিয়ন প্রমুখ অংশ নেন। বৈঠক শেষে আইনজীবীরা বিকালে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে আপিল দাখিল করেন। সেখান থেকে আইনজীবীরা বিকাল ৪টায় যান বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চে।
শুরুতে জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা উপস্থিত রয়েছেন। খালেদা জিয়া আপিল দাখিল করেছেন। কাল (বুধবার) আদালত বন্ধ। বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য আবেদন জানাচ্ছি। এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ বলেন, আপিলে জামিনের আবেদন থাকলে আমাদের যেন কপি দেওয়া হয়। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বলেন, বার সভাপতি তো মেনশন স্লিপ জমা দিলেন। এখানে কি আছে তা আমরাও জানি না। বিচারক বলেন, জামিনের দরখাস্ত থাকলে বিবাদী পক্ষকে কপি দিয়ে দিন। বার সভাপতি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালেই আমরা কপি দিয়ে দেব।
এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেন, ৬৩২ পৃষ্ঠার রায়। এটি পড়তে সময় প্রয়োজন। রবিবার শুনানির জন্য রাখলে ভালো হয়। জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, এই বেঞ্চ বুধ ও বৃহস্পতিবার দুদকের মামলার শুনানি নিয়ে থাকে। ফলে এটা নির্ধারিত দিনেই পড়ে গেছে। এরপরই বিচারকরা এজলাস ত্যাগ করেন। এ সময় দুদক কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান উপস্থিত ছিলেন।
আপিলের আইনগত যুক্তি
আপিলের যুক্তিতে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। তিনি নির্দোষ। তাকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি এবং ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এ ধরনের বানোয়াট মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি বিচারিক আদালত বিবেচনায় না নিয়ে ভুল করেছে। মামলার ৩২ নম্বর সাক্ষী প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাননি মর্মে প্রথমে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা অসত্ উদ্দেশ্যে এই মামলায় খালেদা জিয়াকে সম্পৃক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এছাড়া ট্রাস্টের কোনো অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে যদি অনিয়ম হয় তাহলে প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু এজন্য কোনোভাবেই দুদক আইনে মামলা হতে পারে না। যুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করে রায় দেওয়া হয়েছে বলে আপিলে উল্লেখ করেছেন আইনজীবীরা। এতে বলা হয়েছে, জবানবন্দিতে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ......“অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নির্বিচারে গুলি করে প্রতিবাদী মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে। ছাত্র ও শিক্ষকদের এক নাগারে হত্যা করা হচ্ছে। এগুলো কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি? আপিলে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যকে বিকৃত করে রায়ে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে এটাকে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাত্ ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি?-এক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিল। কিন্তু সেটা বিবেচনা না করে বিচারক তা বিচারিক মনন সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেননি। এ কারণে সাজার রায় বাতিল করে খালেদা জিয়াকে খালাস দেওয়া হোক।
ইত্তেফাক/নূহু