মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে অন্তত ৫৫টি গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দেশটির সরকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বলেছে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা-শূন্য উত্তর রাখাইনের গ্রামে বুলডোজার দিয়ে প্রমাণ মুছে ফেলছে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এসব অপরাধের এলাকা সংরক্ষণ করা জরুরি। তাই গ্রাম নিশ্চিহ্ন করা থেকে বিরত থাকতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি জাতিসংঘ ও এর সংস্থা, নিরাপত্তা পরিষদ এবং মিয়ানমারের দাতা দেশগুলোর দাবি জানানো উচিত। ‘দ্যা আরাকান প্রজেক্ট’ নামে মিয়ানমারের স্থানীয় একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাও কিছু দিন আগে একই অভিযোগ তুলেছিল।
গত বছরের ১১ নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কমপক্ষে ৫৫টি গ্রামের সব অবকাঠামো এবং গাছ-পালা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিধনযজ্ঞ চালানোর সময় যে ৩৬২ গ্রাম সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো এই গ্রামগুলো তার মধ্যেই রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, আগে অগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন দুটি গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আগুনে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত অন্য দশটি গ্রামের শত শত ভবন ভেয়ে ফেলা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ’র এশীয় পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, গুঁড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি যাতে করে জাতিসংঘ নিযুক্ত বিশেষজ্ঞরা সেই সময়ের অপরাধগুলো যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করতে পারে। এভাবে অপরাধের আলামত নিশ্চিহ্নের চেষ্টা সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞের বিচারে বাধা হবে।
এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি এইচআরডব্লিউ। তবে চিত্র বলছে, গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ জানুয়ারি মিয়ানমারের সরকারি গণমাধ্যম জানায়, আটটি ব্যাকহো এবং চারটি বুলডোজার দিয়ে ৭ জানুয়ারি থেকে উত্তর রাখাইনের এলাকা পরিষ্কার করতে শুরু করেছে সরকার। বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনার পর সেখানে সাময়িকভাবে রাখা হবে। মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে তারা শুধু বিধ্বস্ত এলাকাটি পুনর্গঠনের কাজ করছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রামগুলোর উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ ফর হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিসটেন্স এন্ড ডেভোলপমেন্ট (এইইএইচআরডি) এর প্রধান সমন্বয়ক অং তুং থেত গত অক্টোবরে গণমাধ্যমকে বলেন, এপ্রিলে বর্ষা মৌসুম আসার আগেই এই কাজ শেষ করতে হবে। এ কারণে খুব জোরেশোরেই কাজ এগিয়ে চলছে। তবে তাদের কাজ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। তারা বলছে, বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়ার আগেই অপরাধের আলামতগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে সরকার।
IMG0
এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্টে অভিযান শুরুর পর সেনারা শত শত রোহিঙ্গা গ্রামে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, নির্বিচারে গ্রেফতার ও অগ্নি সংযোগ করেছে। এর ফলে ৬ লাখ ৮৮ হাজার রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে মিয়ানমার। এখনো রোহিঙ্গারা ফিরতে শুরু করেনি কিন্তু অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপো গ্র্যান্ডি নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য মিয়ানমারের এখনো সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুলডোজার দিয়ে গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা হচ্ছে যা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। মিয়ানমার সেনারা ব্যাপকভাবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে বলে অভিযোগ উঠলেও দেশটির সরকার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমার সরকার রাখাইনে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনকে প্রবেশে অনুমতি দেয়নি। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা নিধনের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে তারা বাধা দিয়েছে। ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, গ্রাম গুড়িয়ে দেওয়ায় রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া হুমকিতে পড়েছে।
মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে ইইউ
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যার ঘটনায় জড়িত জেনারেলদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত মিয়ানমারের এক জেনারেলের ওপর ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ সদস্যদের বিরুদ্ধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে ব্যাপারে প্রস্তাব করার জন্য ইইউ’র পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকো মঘেরিনিকে বলবেন ইইউর মন্ত্রীরা।
ইত্তেফাক/আনিসুর