এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, খাল ভরাট, বালুমহাল দখল, অন্যের জমিতে মাছের ঘের নির্মাণ করে দখলে রাখা; মাদক ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ বছরে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় অন্ততপক্ষে দশটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার একটিরও কোন কিনারা হয়নি। প্রতিটি হত্যার পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব। সর্বশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীরা তাদের প্রতিপক্ষ গ্রুপের আবুল বাশার বাদশাকে গুলি করে হত্যা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি হত্যার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্দেভাজনদের কেউ কেউ নিহত হয়েছে। বাদশা হত্যার ঘটনার পর আটককৃত আসামি নূর ইসলাম নূরী ডিবি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। এর আগে ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বরে বাড্ডার হোসেন মার্কেটের পিছনে একটি নির্মাণাধীন বাড়ির চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীরা দুই নির্মাণ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে। ওই ঘটনার দুই দিন পর মনির নামে সন্দেহভাজন একজন আসামি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট রাতে বাড্ডার আদর্শনগর পানিরপাম্প এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা, বাড্ডার ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শামসুদ্দিন মোল্লা, ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ মানিক ও যুবলীগ নেতা আবদুস সালাম। নিহত মাহবুবুর রহমান গামার বাবা মতিউর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে আসামি করে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে সাইদুল নামে স্থানীয় এক ছিঁচকে সন্ত্রাসী পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আদালতে চার্জশিট দেয়। বাদী এই চার্জশিটের ওপর নারাজি দিলে আদালত মামলাটি পুন:তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। মামলার বাদী অভিযোগ করেন, আফতাবনগর গরুর হাটের ইজারাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ ভাগ্নে ফারুখ ও বিদেশে আত্মগোপন করে থাকা মেহেদীর নির্দেশে তার ছেলেকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে খুন করা হয়। খুনের মিশনে অংশ নিয়েছিল আরিফ, পবন, পুলক, রমজান, মানিক, মান্নানসহ ১০-১২ জন সন্ত্রাসী। ডিবি যে চার্জশিট দিয়েছে, তাতে গরুর হাটের ইজারার বিষয়টি উল্লেখ করেনি। অথচ এই গরুর হাটের ইজারাকে কেন্দ্র করে ভাগ্নে ফারুক ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার তারা তার ছেলেকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল।
বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, মেরুল বাড্ডায় মাছের আড়তে বাদশা খুনের ঘটনায় তার স্ত্রী শিউলী আক্তার বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় ডিবি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত নূরী ছাড়াও আরিফ, জয় ও মাসুমকে আসামি করেছেন। এদের মধ্যে আরিফের বিরুদ্ধে গত ১৪ নভেম্বর বানানীতে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসে ঢুকে প্রতিষ্ঠানের মালিক সিদ্দিক মুন্সীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। আরিফ বাড্ডায় এর আগে আরো বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাড্ডা এলাকায় এসব অপকর্মে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভাগ্নে ফারুক গ্রুপ, মেহেদী গ্রুপ, রায়হান গ্রুপ, ডালিম-রবিন গ্রুপ, জাহাঙ্গীর-আলমগীর গ্রুপ ও অনিক গ্রুপ। আরিফ বাড্ডা এলাকার ভাগ্নে ফারুক গ্রুপের সক্রিয় ক্যাডার। আরিফ ঢাকা মহানগর (উত্তর) স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফরহাদ হোসেনের ছোট ভাই। ফরহাদ হোসেন ২০০৯ সালে কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান।
২০০৯ সালের বাড্ডায় নাজিমকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর মেহেদী গ্রুপের অন্যতম ক্যাডার কাবিলা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি আনন্দনগরে দুই গ্রুপের গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আমির হোসেন নামের একজন। একই বছরের ৩ মে বাড্ডা জাগরণী সংসদ ক্লাবে আফতাবনগর পশুর হাটের ৬০ লাখ টাকা চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর একটি বৈঠক হয়। বৈঠক চলাকালে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন রাহিনকে। একই মাসের ১৬ তারিখ বাড্ডায় দুলাল হোসেন নামের এক পুলিশ সোর্সকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর দিনদুপুরে গুলি ও বোমা ছুড়ে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মামুনকে। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর-আলমগীরের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠে। এছাড়া প্রভাব-প্রতিপত্তির বিরোধে গত ১০ বছরে বাড্ডায় খুন হন সাইদুর, মাসুম, আলা, রুবেল ও তাইজুলসহ আরো কয়েকজন।