সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত আছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মালিবাগ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দায়িত্বপালনকালে দ্রুতগামী একটি কাভার্ড ভ্যানের চাপায় কাঁচপুর হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফরিদ আহম্মেদ নিহত হন। তিনি লাঙ্গলবন্দের ব্রক্ষ্মপুত্র নদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের স্নান উপলক্ষে রাস্তায় যাহাতে যানজট দেখা না দেয়, এইজন্য রাত হইতে দায়িত্বপালন করিতেছিলেন। এইভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রাণ হারাইতেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্দোলন ও আলোচনার ঝড় উঠিতেছে। একসময় সেই ঝড় আবার থামিয়াও যাইতেছে। সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে পথচারীর অসচেতনতাসহ নানাবিধ কারণ রহিয়াছে। তবে সবচাইতে বড় কারণ হইল একশ্রেণির চালকের বেপরোয়া মনোভাব। তাহারা কতটা বেপরোয়া হইতে পারে তাহার অন্যতম নজির হইল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকেও তাহারা অবলীলায় চাপা দিতে পরোয়া করে না। সোনারগাঁওয়ের ঘটনা তাহারই সাক্ষী। ইহা স্রেফ হত্যাকাণ্ড ছাড়া আর কিছু নহে। ইহার আগে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভার সামনের সড়কে নম্বরহীন একটি ট্রাক আটকায় ট্রাফিক পুলিশ। গাড়ির কাগজপত্র চাহিতে গেলে তাহাকে ও তাহার একজন সহকর্মীকে অকস্মাত্ ধাক্কা দিয়া আহত করিয়া গাড়ি লইয়া বেপরোয়াভাবে পালাইতে থাকে ট্রাক চালক। একসময় পুলিশের একজন এএসআই ট্রাকের পিছু নেয়। কিন্তু সেই ট্রাকটি একটি অটোরিকশাকে চাপা দিয়া আবার দুর্ঘটনা ঘটায় এবং ইহাতে তিনযাত্রী আহত হন। অন্যদিকে উল্টাপথে গাড়ি চলিতে না দেওয়ার কারণেও পুলিশের দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশকে গালিগালাজসহ মারিবার দৃষ্টান্ত আছে। কয়েক মাস আগে হাতের লাঠি কাড়িয়া নিয়া এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে বেধড়ক পেটানোর ঘটনাও ঘটিয়াছে সিলেটে।
উপর্যুক্ত তিনটি ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, চালকরা এত দুঃসাহস পায় কোথা হইতে? তাহাদের কি মানুষ হত্যার লাইসেন্স দেওয়া হইয়াছে? আসলে নিরাপদ সড়কের কথা আমরা যতই বলি না কেন, শক্ত আইন না হইলে ও তাহা যথাযথভাবে কার্যকর করিবার ব্যবস্থা না থাকিলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল সহসা বন্ধ করা যাইবে না। আইন দুর্বল বলিয়াই এখন পরিকল্পিতভাবে মানুষকে পিটাইয়া রাস্তায় ছুঁড়িয়া বিভিন্ন যানবাহনের চাপায় মারিয়া ফেলিবার ঘটনাও ঘটিতেছে। যেইখানে সড়কে দায়িত্ব পালনকারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই অনিরাপদ, সেইখানে সড়কে সার্বিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হইবে কিভাবে? সামরিক-বেসামরিক সব সরকার সড়কে চালকদের এই বেপরোয়া মনোভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করিয়াছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শ্রমিক-মালিকদের আন্দোলনের চাপে তাহারা ব্যর্থ হইয়াছেন। গত বত্সর সড়ক পরিবহন আইন পাস হইয়াছে সংসদে। ইহাতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ক্ষেত্রে দোষী চালকের জেল-জরিমানা কিছুটা বাড়িয়াছে বটে, কিন্তু নীতিমালার অভাবে তাহার বাস্তবায়ন নাই। ইহার নবম অধ্যায়ে দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন করিবার কথা বলা হইলেও এই ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে না। আহতদের চিকিত্সা ও গাড়ির বীমা করিবার ব্যাপারে যে বিধান রহিয়াছে তাহাও উপেক্ষিত। এমনকি এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও মানা হইতেছে না। আসলে বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে কত ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে— তাহা এখানে বিবেচ্য বিষয় নহে। সড়ক দুর্ঘটনার টেকসই সমাধান আমাদেরই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে।