আমাদের এই বাংলাদেশে গত সাড়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে শুধু মার্চ মাস বলে আর কোনো কিছু নেই। তার আগে চিরকালের জন্যেই আগুনে গরম একটা বিশ্লেষণ দিয়ে বলছি রক্তঝরা মার্চ। এখন যাদের বয়স ষাটোর্ধ্ব তারা সবাই এই মাসটির কথা মনে করতে পারবেন। এই মাসেই বাঙালি শুধু বিদ্রোহীই হয়নি দেশকে স্বাধীন করবার জন্য মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়ে। আমরা জানি ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং নিরস্ত্র মানুষদের অকাতরে হত্যা করে, অগ্নিসংযোগে দেশটাকে ছারখার করে দিতে চেয়েছিল। লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও হত্যার এমন এক বিভীষিকা শুরু করেছিল যে যা পৃথিবীব্যাপী মহাযুদ্ধেও এরকম দেখা গিয়েছে কিনা সন্দেহ। দুই বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল; কিন্তু আমরা জানি গত শতাব্দীতে ৭১ সালের ২৫শে মার্চ একমাত্র ঢাকা শহরেই কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছিল, অগ্নিসংযোগ করে ছারখার করে দেবার চেষ্টা করেছিল। এই বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত আর কোথাও সংঘটিত হয়নি। আধুনিক মারণাস্ত্রের নির্বিচার প্রয়োগে ঢাকার পথঘাট মানুষের রক্তে ভিজে গিয়েছিল। আমাদের স্মরণে পৃথিবীতে গণহত্যার যত বিবরণ আসে তার কোনোটির সঙ্গেই একাত্তর সালের মার্চ মাসের তুলনা করা যায় না। তার পর থেকে গোটা বাংলাদেশেই শুরু হয়ে যায় অকথ্য গণহত্যা, ধর্ষণ এবং লুণ্ঠনের ঘটনা। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই গোটা বাঙালি জাতি প্রতিরোধে একাট্টা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
ঐ বছর এপ্রিল মাসের মধ্যেই শুরু হয় গণযুদ্ধ। এলোমেলোভাবে প্রতিরোধ অল্পদিনের মধ্যেই সংগঠিত রূপ নিলোএবং গণযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে গেলেন বাঙালি সাধারণ মানুষ। তাদের সংখ্যা আমাদের জানা নেই। আমার তো মনে হয় প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ সকলেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হয়, কেউ সংগ্রামী সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। আমরা যারা সেই সময়টা প্রত্যক্ষ করেছি, আমার নিজেরই এই কথাটা মনে হয় যে, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ কোনো না কোনোভাবে এই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, ঐক্যবদ্ধ জাতির এই কঠিন মূর্তি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
মোটামুটি মার্চ মাস ধরে তারা আমাদের রক্ত ঝরিয়েছে একথা ঠিক কিন্তু এর কিছু পরেই পাল্টা প্রতিরোধ এবং প্রতি আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমি এরকম সমগ্র জনসাধারণের পক্ষ থেকে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সহযোগিতা, ঐক্য প্রত্যক্ষ করেছি তাতে মনে হয় সমগ্র বাঙালি জাতি নিশ্ছিদ্র এবং নিরেট একটা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়েও পড়েছিল এবং এই দুর্বার ঐক্য তৈরি হতে তিন/চার মাসের বেশি সময় লাগেনি এবং মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাসেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে দেখা যায়। আমরা নিজেরাই তা অর্জন করেছি। পাশের দেশ ভারত আমাদের সহযোগিতা করেছে এমনকি যৌথ বাহিনীও গঠিত হয়েছে। আমরা সবাই জানি ৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৬ তারিখে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং মানচিত্রে পৃথিবীতে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
[লেখক: কথাশিল্পী]
ইত্তেফাক/নূহু