বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত্ চ্যালেঞ্জ

মো. মানিক হোসাইন

কয়েক শতাব্দী পূর্বে একটি দেশের নিরাপত্তা ভাবনা ছিল খুব সীমাবদ্ধ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিজ ভূখণ্ড  রক্ষা করাই ছিল নিরাপত্তা ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। সরকার বা রাজা তখন নিজ দেশকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করাকেই মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতো। কিন্তু বর্তমানে একটি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর শক্তি সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে না বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু নতুন সমস্যা, যেগুলো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন করতে পারে।

শিল্পের এই যুগে শিল্পবাণিজ্য ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়। মিল ফ্যাক্টরি যত বাড়বে ততো বেশি জ্বালানি দরকার হবে। আমরা যে জ্বালানি ব্যবহার করি তার অধিকাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি এবং ব্যবহারে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু শিল্পের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে চাইলে জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। দেশের নিরাপত্তা ইস্যুতে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধরতে গেলে বর্তমান পৃথিবী জ্বালানির উপর দাঁড়িয়ে আছে আর তাই বড় বড় দেশগুলো ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি মজুদ করে রাখছে। আমাদেরও জ্বালানি মজুদ অথবা জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প ভাবতে হবে।

শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উত্পাদন কাজে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে এবং এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির দরুন হিমালয় ও এন্টার্কটিকা মহাদেশের জমে থাকা বরফ গলছে যার দরুন সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সমুদ্র উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য খুব ভয়াবহ একটা ব্যাপার। উত্তরের ধনী দেশ (ইউ এস এ, রাশিয়া, পশ্চিম ইউরোপের দেশ ) গুলো প্রাথমিকভাবে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারলেও দক্ষিণের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ ঝুঁকিতে আছে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানির জন্য দেখা দেয় বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এবং কয়েক বছর পরপর, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের কারণে বারবার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাও বর্তমানে দেশের নিরাপত্তার একটি অংশ। কারণ দেশের নিরাপত্তা বলতেই তো দেশের জনগণের নিরাপত্তা।

জীবনধারণের জন্য খাদ্য এবং সুপেয় পানির কোনো বিকল্প নেই। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চিন্তার বিষয় হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা। আমাদের আবাদি জমি নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং সুপেয় পানির স্তরও দিনদিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এখন থেকে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে খাদ্য ও পানি আমাদের জন্য একটি বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য শিক্ষা, চিকিত্সা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও সরকারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সবার জন্য শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া উচিত কর্মমুখী। চিকিত্সা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার, কিন্তু বাংলাদেশে গড়ে প্রতি ১৮৪৭ জন নাগরিকের জন্য মাত্র একজন ডাক্তার। শুধু গ্রামের দিকে তাকালে সে অবস্থা আরো ভয়াবহ। কাজেই এটা বলা যায় জনগণের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।  যে-হারে জনসংখ্যা বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বাংলাদেশ তার বিশাল জনসংখ্যাকে উত্পাদন  কাজে ব্যবহার না করতে পারলে তারা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের দেশের একটি বড় সুবিধা হলো দেশের জনসংখ্যার মোট ৩০ ভাগই হলো তরুণ, এই বিশাল সংখ্যার তরুণদের উপযুক্ত শিক্ষা ও ট্রেনিং দিয়ে কাজে লাগাতে পারলে উত্পাদন বেড়ে যাবে কয়েকগুন যা আমাদের অর্থনীতিকে করবে আরো সমৃদ্ধ। কিন্তু তরুণ জনসম্পদ কাজে না লাগাতে পারলে জনসংখ্যা হয়ে যাবে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা।

দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে নীতি নির্ধারকদের সেনাশক্তি ছাড়াও জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয়, কর্মসংস্থান, জ্বালানি এবং মনুষ্য সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা পূর্বপরিকল্পিত হতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায়  রাখার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে হবে এবং প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রস্তুতি থাকতে হবে। মোদ্দাকথা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

n লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়