চাই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

নিগার সুলতানা সুপ্তি

নির্যাতন, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ, ইভটিজিং এবং হত্যা সভ্যতার যে কোনো ক্ষেত্রেই ধিক্কারজনক ঘটনা। একথা সত্য যে, বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই এর হার বেশি, যা আমাদের দারুণভাবে আতঙ্কিত করে।  তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কারণ অনেকেই আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে সরে গেছেন। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ও তার আংশিক রূপায়ন সত্ত্বেও নারীকে অবহেলিত ও অনুন্নত সম্প্রদায় হিসাবে ভাবার প্রবণতা প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে আমাদের সমাজের প্রতি স্তরেই। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা চূড়ান্তভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি বলেই অন্যের আর্তনাদে আমাদের হূদয় আর তেমন আন্দোলিত হচ্ছে না। নিজেকে নিয়েই আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে, অন্যের কষ্ট অনুভব করার মতো মন কোথায়? সেই কারণে আমাদের দেশে চাঞ্চল্যকর কিছু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও তা মূলত সীমাবদ্ধ থেকেছে নারী সংগঠন ও স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে। কিন্তু এই ভয়াবহ অবস্থা প্রতিরোধ করতে এবং সমাজ থেকে এই বিপর্যয় দূর করতে সমাজের মূলধারা বিশেষত সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদরা জাতীয় ঐকমত্য নিয়ে একত্রে বসেননি। আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখি, আমাদের বড় বড় সামাজিক বিপর্যয় এবং নারী নির্যাতনের ব্যাপারে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ সমান নীবরতা পালন করেন। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এক ধর্ষণের ঘটনা পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ বর্বরতার বিচার চেয়ে পুরো ভারতবাসী ফুঁসে উঠেছে। তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তীব্র আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে দেশটির ভেতর। অথচ আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট নারীর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। যৌন হয়রানির শিকার কিশোরী বা তরুণী বড় হয়ে সে অন্য পুরুষ এমনকি নিজের স্বামীকেও ঘৃণা করতে পারে। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে, যা নিয়ে বেশিরভাগ নারীই নীরব থাকে। পিতামাতা তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। কারণ, শিক্ষক দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে। গার্মেন্টস, কর্পোরেট সেক্টর, এনজিও, মিডিয়া, সরকারি অফিস প্রায় সবখানেই ক্ষমতার অপব্যবহার হয়। চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা প্রলোভনের মাধ্যমে যৌন হয়রানি করা হয়ে থাকে । কিন্তু এসব নিয়ে যৌন হয়রানির শিকার নারীটি দুর্নামের ভয়ে সচরাচর মুখ খোলে না ।

জাতিসংঘ, নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কিছু বহুজাতিক সংস্থায় যৌন হয়রানির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের মতো বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি নেওয়া কি খুব কঠিন? এক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি দরকার। বর্তমান নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাউন্সিলর নিয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে। কিন্তু পলিসি তৈরি করতে সরকার কেন এখনো পিছিয়ে আছে? শুধু পলিসি নয়, সরকারের উচিত হবে, এক্ষত্রে পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর হতে দেওয়া। যৌন হয়রানি রোধে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজস্ব সেফটি নেট ও মেকানিজম থাকাও জরুরি।

সুতরাং নারীর সম্মান, নারীর বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ, পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ ও হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। এক্ষেত্রে সচেতন, সভ্য, শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব অপরিসীম- এ কথা অনস্বীকার্য।

n লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়