গানে কথনে ছায়ানটের বর্ষবরণ
ইত্তেফাক রিপোর্ট
রাজধানীতে প্রতিবছর ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদযাপন। ৫২ বছর ধরে বৈশাখে নতুন আবাহন নিয়ে হাজির হয়। নিঃসন্দেহে জাতির জীবনে এক প্রেরণাসঞ্চারি ঘটনা।
সামাজিক সকল অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে শুভবোধ জাগিয়ে তোলার মানসে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে গানে গানে বরণ করেছে ছায়ানট। ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’ এই আহ্বান নিয়ে সাজানো হয়েছিল রমনার বটমূলের পহেলা বৈশাখের প্রভাতী আয়োজন। তবে যথারীতি, পহেলা বৈশাখ ভোর সোয়া ছয়টায় বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানানো হয় রাগালাপ দিয়ে। অসিত কুমার দে’র রাগ ললিত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। ভোরে শিল্পীরা গেয়েছেন প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের গুচ্ছ। এরপরেই গেয়েছেন অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী। গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালবাসবার প্রত্যয় দীপ্ত উচ্চারণ রয়েছে তাতে।
শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিয়ে, ছোট বড় মিলিয়ে এবারের অনুষ্ঠানে সম্মেলক গান পরিবেশন করেছেন শ’খানেক শিল্পী। অনুষ্ঠানে শিল্পীরা পরিবেশন করেন ১৩টি একক ও ১৩টি সম্মেলক গান এবং ২টি আবৃত্তি। ছায়ানটের আহ্বান অনুযায়ী রবীন্দ্র রচনা থেকে বেছে নেওয়া হয়েছিল কবিতা দুটি। ‘প্রশ্ন’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন ত্রপা মজুমদার এবং ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন জহিরুল হক খান। একই ধারায় গানগুলি নির্বাচন করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, লালন শাহ্, মুকুন্দ দাস, অজয় ভট্টাচার্য, শাহ্ আবদুল করিম, কুটি মনসুর, সলিল চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে। একক কণ্ঠে গান গেয়ে শোনান খায়রুল আনাম শাকিল, ফারজানা আক্তার পপি, তানিয়া মান্নান, মহিউজ্জামান চৌধুরী, লাইসা আহমেদ লিসা, মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য, সুমন মজুমদার, নাহিয়ান দরদানা শুচি, সঞ্চয় কবিরাজ, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, প্রমীলা ভট্টাচার্য, শারমিন সাথী ইসলাম ও বিমান চন্দ্র বিশ্বাস। এছাড়াও সম্মেলক কণ্ঠে গান গেয়ে শোনান ছায়ানটে শিশু ও বড় শিল্পীদের দল।
জাতীয়সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানার আগে ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানান তার কথনে।
সন্জীদা খাতুন বলেছেন, ‘কিছু মানুষ কি পাষণ্ড হয়ে উঠলো?’ ‘নববর্ষ যদি ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতাবোধের উন্মেষ না ঘটাতে পারে, তবে নতুন দিন কী বার্তা নিয়ে আসে?’ রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ছায়ানট সভাপতির বক্তব্যের প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল এমন নানা প্রশ্ন আর হতাশার প্রতিধ্বনি। তারপরও তিনি প্রত্যাশা জানান, ‘অনাচারের বিরদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’।
সন্জীদা খাতুন তার লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন, ‘বত্সরকাল পেরিয়ে আমরা আবার নতুন দিনের মুখোমুখি। কেমন সময় পেরিয়ে এলাম? চোখ মেললে কিংবা কান পাতলে নিত্যই শিশু-নারী, বল-ভরসাহীন মানুষ তথা সমগ্র মানবতার ওপরে নির্মম আচরণের সংবাদ পাই। নিয়ত মার খাচ্ছে সমাজের ধারণা। কোথায় যাচ্ছি আমরা? নিষ্কলুষ শিশুসন্তান অত্যাচারের শিকার হয় কী করে? সমাজ কি পিতামাতা, ভাইবোন, সন্তানসন্ততির গৃহ আর প্রতিবেশী নিয়ে গঠিত শান্তির নিবাস নয়? স্বার্থান্বেষী অমানুষদের আত্মসুখ সন্ধানের ফলে নির্যাতনের হাত থেকে পরিত্রাণ পায় না কচিকাঁচা থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীসহ সমাজের কোনও মানুষ।’
তিনি সবাইকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের অন্তরে ইচ্ছা জাগুক, ‘ওরা অপরাধ করে’ কেবল এই কথা না বলে, প্রত্যেকে নিজেকে বিশুদ্ধ করবার চেষ্টা করি। আর আমরা যেন নীতিবিহীন অন্যায়-অত্যাচারের নীরব দর্শকমাত্র হয়ে না থাকি। প্রতিবাদে, প্রতিকার সন্ধানে হতে পারি অবিচল। নববর্ষ এমন বার্তাই সঞ্চার করুক আমাদের অন্তরে।
পরে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ জানান ছায়ানট শিল্পী ও উপস্থিত সবাই। নীরবতা পালন করেন এক মিনিট। নুসরাত, তনুদের ওপর অত্যাচার-অবিচারের প্রতিবাদে এই নীরবতা পালন করেন সবাই।