পুড়িয়ে মানুষ হত্যাকারীদের ক্ষমতায় আসতে দেবেন না

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, যারা যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধী, যারা এতিমের টাকা চুরি করে, আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারে, দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে, তাদের আর কোনোদিনই ক্ষমতায় আসতে দিবেন না। তারা যেন আর ক্ষমতায় এসে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

গতকাল বুধবার বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় সভাপতির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ এ জনসভার আয়োজন করে। প্রতিবছর এই ঐতিহাসিক দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলেও গত ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এবছর জনসভাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ নিয়ে নিজের লেখা অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ আবৃত্তি করেন কবি নির্মুলেন্দু গুণ।

শেখ হাসিনা বলেন, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কারো কাছে মাথানত নয়, বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে মর্যাদার সঙ্গে চলব। জাতির পিতা আমাদেরকে সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলব। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একটা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। জাতির পিতার সেই লক্ষ্য সামনে নিয়ে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সারাবিশ্বে সম্মান পেতে যাচ্ছি অতি শীঘ্রই।

বর্তমান সরকারের উন্নয়ন-অগ্রগতির সঙ্গে বিগত সরকারগুলোর কর্মকাণ্ডের তুলনামূলক বিচার করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের উন্নয়ন হয়, দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যায়। কিন্তু তার পূর্বে যারা ক্ষমতায় ছিল সেই জেনারেল জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া সরকার তো দেশের উন্নতি করতে পারেনি। তার মূল কারণ   একটাই। তারা তো দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসই করত না।

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের মাটিতে কোনো জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও মাদকের স্থান হবে না। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই সভায় যারা আছেন অথবা গোটা বাংলাদেশের সকলের কাছে আমার আহ্বান থাকবে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস এবং মাদক যেন কোনোভাবেই আমাদের যুব সমাজকে নষ্ট করতে না পারে। তার জন্য আপনারা সজাগ থাকবেন। এ সময় মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, পদ্মা সেতুসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্রত্যেকটি জায়গায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মানবতার জন্য কাজ করি। আর যারা মানবতাবিরোধী কাজ করেছে, যারা গণহত্যা করেছে, লুটপাট করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, মা-বোনের ইজ্জত লুটেছে, হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে, দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান-এই যুদ্ধাপরাধী ও খুনিরা যেন কোনোদিন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। এর জন্য সমস্ত দেশের মানুষ, স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সকল মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাস করেন অন্তত তারা এ ব্যাপারে সজাগ থাকবেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের প্রায় দশ লাখের উপরে মানুষের ওপর অত্যাচার হয়েছে। তারা বাংলাদেশের কাছে আশ্রয় চেয়েছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের আবেদন কখনো শেষ হবে না। এই ভাষণে জাতির পিতা একদিকে স্বাধীনতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে গেছেন। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যখন পা বাড়িয়েছিলেন, তখনই তাকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঙালি চলবে, মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বাঙালি জাতির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় একটা ভাষাভিত্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছিলেন জাতির পিতা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য মাত্র সাড়ে ৩ বছর হাতে সময় পেয়েছিলেন জাতির পিতা। এ অল্প সময়ে একটা দেশকে অনেক দূর নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে চরম আঘাত আসে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের অবৈধ ক্ষমতা দখলের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর যারা খুনি, জিয়াউর রহমান সেই খুনিদের সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেন, তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করেন, তাদের যেন বিচার না হয় সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। একটি দেশে যখন খুন হয়, তখন সবাই বিচার চায়। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে নেই যে রাষ্ট্রপতিকে খুন করা হয়েছে, তার বিচার হবে না এমন আইন প্রণয়ন হবে। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে।  

২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে দেশের সম্পদ গ্যাস বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে রাজি হইনি বলেই ষড়যন্ত্র করে আমাদের ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি। ওই নির্বাচনে আমরা ভোট বেশি পেলেও ক্ষমতায় আসতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জনসভার শুরুতেই বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

অন্য বক্তারা যা বলেন

জাতীয় সংসদের উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, এই দেশ কখনো বাঙালির ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাঙালির জন্য একটি দেশ হবে।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিত্সার নিশ্চয়তা শেখ হাসিনার সরকার বাংলার মানুষকে দিচ্ছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র চলছে।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, একটি যুদ্ধ কীভাবে হতে পারে, তার দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন ৭ মার্চের ভাষণে। এ জন্যই তিনি বলেছেন, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে তোমরা ঝাঁপিয়ে পড়বে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, জাতির পিতা দেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। আর তার কন্যার হাত ধরে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অশিক্ষা, অজ্ঞতা, স্বাস্থ্যহীনতা থেকে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি পেয়ে মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে চলছে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির গৌরব বাংলার জনগণের। অথচ এই ভাষণ জিয়া নিষিদ্ধ করেছিল।  

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বাধীনতার প?ক্ষের শ?ক্তি?কে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা স্বাধীনতার পক্ষের শ?ক্তি য?দি ঐক্যবদ্ধ থা?কি তাহ?লে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয় লাভ কর?বো।  

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কর্মদিবসে জনসভা করায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আজকের দিনটি বাঙালির সম্পদ। ঐতিহাসিক এই দিনটি পাল্টানোর ক্ষমতা কারও নেই। ভোগান্তির বিষয়টি সহনশীলতার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহারা খাতুন বলেন, আগামী নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে জয়লাভ করে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী বানানোই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।   

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণে দুটি বিষয় তুলে ধরেন। একটি স্বাধীনতা, অন্যটি অর্থনৈতিক মুক্তি।

ইত্তেফাক/নূহু