ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার চাপ

নেপালের ত্রিভুন বিমান বন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধস্ত হওয়ার ঘটনা তদন্ত দ্রুত করতে চাপ দিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী ৬ মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাবার জন্য নেপাল সরকারকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত অনুরোধ জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে নেপালস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মাশফী বিনতে শামস ইত্তেফাককে বলেন, ‘দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন পেতে আমরা নেপাল সরকারকে সহায়তা করতে চাই। এ কারনে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ৩ জন সদস্যকে তাদের তদন্ত টিমে সংযুক্ত করতে অনুরোধ করেছি। তারা রাজি হয়েছেন। আমরা তাদেরকে বলেছি আগামী ৬ মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে।’

নেপালে সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, নেপাল সরকার গঠিত তদন্ত টিম কাজ শুরু করেছে। তবে নেপালের তদন্ত কাজ কবে শেষ হতে পারে সে ব্যপারে তারা কোন ধারণা দিতে পারেনি। তারা বলছেন, এসব তদন্ত খুবই সুক্ষ্মভাবে করতে হয়, সেকারণে এক থেকে দেড় বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।

এদিকে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অথরিটির (আইকাও) বিধান অনুযায়ি বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত এক বছরের মধ্যে করতে হবে। সে নিয়মে তদন্ত কাজ করতে গেলে নেপালে ৬ সমস্য টিমে আরো জনবল যোগ করতে হবে। বাংলাদেশ তিনজনকে এ কাজে সম্পৃক্ত করার অনুমতি পেয়েছে। আগামী দুই এক দিনের মধ্যে তারা তদন্ত টিমে যোগ দিবেন বলে রাষ্ট্রদুত জানিয়েছেন।

প্রাথমিক তদন্তে কিছু জানা গেছে কিনা জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মাশফী বিনতে শামস বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত কী আভাস মিলেছে তা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে জানা সম্ভব নয়।

বিমান দুর্ঘটনায় জীবিতদের মারাত্মক আতঙ্ক গ্রাস করেছে। হাসপাতালে চিকিত্সাধীনরা দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেও ফেরার জন্য বিমানে চড়তে চাইছে না। তাদের সকলের কথা বিমানে উঠলেই মারা যাবো। আর কখনই বিমানে চড়বো না। পুড়ে যাওয়া স্বজনকে বাঁচাতে তাদের মধ্যে আপ্রাণ চেষ্টা রয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের মর্গে অপেক্ষা করেও প্রাণ হারানো স্বজনের লাশ দেখার সুযোগ পায়নি কেউ। গত চার দিনে তাদের লাশ না দেখতে পেয়ে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

কাঠমান্ডুর তিনটি হাসপাতালে ৮ জন চিকিত্সাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন কবির হোসাইন, ইমরানা কবির, শেখ রোবায়েত রশিদ। তবে একই হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আলমুন নাহার অ্যানী, কামরুন নাহার স্বর্ণা এবং মেহেদী হাসান আজ শুক্রবার দেশে ফেরত আনা হতে পারে। নরভিক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিত্সাধীন রয়েছেন ইয়াকুব আলী।

ইয়াকুব আলীর পরিবারের লোকজন উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে দিল্লি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছেন তবে চিকিত্সকরা হাসপাতাল থেকে তাকে এখনো ছাড়পত্র দেয়নি। কবির হোসেনের শারীরিক অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। এমরানা কবির হাসির অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি জীবন মৃত্যুর মাঝামাঝি রয়েছেন। শেখ রোবায়েত রশিদের অবস্থাও অপরিবর্তিত।

গতকাল হাসপাতালের অর্থোপেডিক স্পেসালিস্ট ডা. রাজিব রাজ মানান্দার এই প্রতিবেদককে বলেন, আইসিইউতে থাকা ইমরানা কবির হাসির অবস্থা খুবই আশংকাজনক, কবির হোসাইন এবং রোবায়েতের অবস্থা স্থিতিশীল, অন্যদের অবস্থা উন্নতির দিকে। ওই তিনজনকে এ পরিস্থিতিতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া ঠিক হবে না। তিনি আরো বলেন, এই তিনজনের সুস্থ হতে অনেক দিন সময় লাগবে। সে কারণে তাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্ভব না। অ্যানি, কামরুন নাহার স্বর্ণা এবং মেহেদী হাসান বিমানে ট্রাভেল করতে পারবেন বলে চিকিত্সকরা মনে করছেন।

এদিকে আহত মো. কবীর হোসাইনের ছেলে হেলাল ইবনে কবির বলেন, তার বাবা পা নাড়াতে পারছেন না। তার অবস্থার উন্নতি হলে তাকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়া হবে।

রাজশাহী প্রকৌশল ও  প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইমরানা কবির হাসির সিটিস্ক্যান করতে হবে। তবে তার অসুস্থতা এতই গুরুতর যে চিকিত্সকরা তার তেমন কোন চিকিত্সা ব্যবস্থা দিতে পারছেন না। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, হাসিকে নিয়ে আশঙ্কা কাটছে না। তার শরীরের ৭০ ভাগ পুড়ে গেছে। হাসির পরিবারের সদস্যরা জানান, অবস্থা একটু স্থিতিশীল বললেই তাকে ভারতে নিয়ে যাবেন তারা।

কাঠমান্ডুর টিচিং হাসপাতালের ফরেনসিক ল্যাবের সামনে স্বজনরা মরদেহ শনাক্ত করার জন্য নির্ধারিত ফরম পূরণ করেছেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৪টির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও পরিচয় শনাক্ত হয়নি একটিরও। স্থানীয় পুলিশের কড়াকড়ি আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বাধায় বারবার ফিরতে হচ্ছে স্বজনদের।

নিহতদের ব্যাপারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফী বিনতে শামস বলেন, ময়নাতদন্ত এখনো চলমান। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩০ জনের সুরত্হাল প্রতিবেদন করা হয়েছে। পুড়ে যাওয়া অন্তত ৫ জনের শনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ টেস্ট করা লাগতে পারে। সেই প্রক্রিয়া শেষ করতে সর্বোচ্চ ২১ দিনের সময়ের ব্যাপার আছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশি কারা তাদের চিনতেও ততক্ষণ অপেক্ষা করা লাগতে পারে। অবশ্য বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ থেকে একটা মেডিক্যাল টিম গেছে।

বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫১ প্রচারিত হলেও মূলত ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। বাংলাদেশিদের মধ্যে আহত ১০ জন। তাদের মধ্যে ২ জন উন্নত চিকিত্সার জন্য নেপাল ত্যাগ করেছেন। এদের মধ্যে শাহরীন আহমেদকে গতকাল দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর রেজোয়ানুল হককে গত বুধবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়েছে। আর নিহতদের মরদেহ ঢাকায় পাঠাতে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ৫ দিন। ফলে অপেক্ষার পালা বাড়ছেই।

দুর্ঘটনায় সাংবাদিক আহমেদ ফয়সালসহ নিহতদের স্মরণে শোকর্যালি করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় ডিআরইউ এর সামনে থেকে শোকর্যালিটি শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। পরে সংগঠনের সদস্যরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন। কর্মসূচির শুরুতে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

ইত্তেফাক/নূহু