আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু-ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা

 
সাভার থেকে আইরিন সুলতানা তার চার বছরের শিশু নিষাদকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ক্যান্সার বিভাগের বর্হিবিভাগে এসেছে। হঠাত্ নিষাদের পুরো শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। গত তিনদিন যাবত্ কিছুই খাচ্ছে না বলে জানান শিশুটির মা। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিত্সক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এখানে আসার পর জানতে পারেন নিষাদের ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে।
 
চিকিত্সক জানান, নিষাদের ক্যান্সারটি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদী সঠিক চিকিত্সা গ্রহণ করলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে সে।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ক্যান্সার বর্হিঃবিভাগে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এই বিভাগের সামনে প্রচুর ভিড়। প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু চিকিত্সা সেবা নিতে আসে এখানে। এ ইউনিটের আউটডোরে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর ভিড় লেগেই থাকে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এই সংখ্যা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা ছুটে আসেন এখানে।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়েট্রিক অনকোলজি বিভাগে সূত্রে জানান যায়, ইনডোর ও আউটডোর মিলে নতুন-পুরানো মিলিয়ে বছরে ৪ থেকে ৬ হাজার শিশু এই বিভাগে চিকিত্সা সেবা নেন। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিত্সার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পৃথক কোনো হাসপাতাল নেই। সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ শয্যার পেডিয়েট্রিক অনকোলজি ইউনিটই ভরসা। দীর্ঘমেয়াদী চিকিত্সা হওয়ায় সেখানে একটি বেডের জন্য আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের মাসের পর মাস অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। অনেক শিশু বেড পাওয়ার আগেই মারা যান। অনেকে আবার বেড পেলও চিকিত্সার খরচ জোগাড় করতে না পেরে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। অন্যদিকে, বেডের অভাব থাকায় শিশু রোগীদের প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বাড়ি ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন চিকিত্সকরা।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানান যায়, প্রতিবছর দেশে আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় হাজার শিশু-ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের শতকরা ৮০ ভাগ সুচিকিত্সা না পেয়ে মারা যায়। আর এসব কারনে দেশে শিশু ক্যান্সার রোগে মৃত্যু হারও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। তবে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।
 
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, সময়মতো ও যথাযথ চিকিত্সা গ্রহণ করতে পারলে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে শতকরা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সম্পূর্ণভাবে নিরাময় সম্ভব। তারা জানান, একজন ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর চিকিত্সায় বিভিন্ন মেয়াদে ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এ ধরনের রোগের চিকিত্সায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ও বিশেষ ব্যবস্থাধীনে অবিরাম পর্যবেক্ষণে প্রয়োজন। ঢাকা ছাড়া দেশের অন্যান্য জায়গায় এ সকল সুবিধা প্রায় অনুপস্থিত।
 
চিকিত্সকরা দুঃখের সঙ্গে জানান, বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষ মূলতঃ হতদরিদ্র হওয়ায় তাদের সন্তানদের ক্যান্সার হলে চিকিত্সা করাতে পারেন না। ঢাকায় এসে দীর্ঘদিন অবস’ান করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে বিনা চিকিত্সায় এ সব শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু ক্যান্সার বিভাগের চেয়াম্যান প্রফেসর এম.এ. মান্নান বলেন, মাত্র ২৮টি শয্যায় এত বিপুল সংখ্যাক ক্যান্সাস আক্রান্ত শিশুদের চিকিত্সা সেবা দেয়া সম্ভব হয় না। সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতালে শিশু ক্যান্সার বিভাগ থাকা খুই জরুরি বলেও মনে করেন তিনি। তবে আশার কথা হলো দেরিতে হলেও সরকারিভাবে দেশের ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে পৃথক শিশু ক্যান্সার ইউনিট খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডাক্তারদের পোস্ট সৃষ্টিও করা হয়ে গেছে। এখন শুধু চিত্সিকদের পোস্টিং দেওয়ার অপেক্ষা মাত্র। শিশু ক্যান্সার রোগীদের দুর্ভোগ এবং মৃত্যুহার কমাতে অতিদ্রুত পোস্টিং দেয়া দরকার বলে মনে করেন প্রফেসর মান্নান।
 
২০০৫ সালে দেশের নেতৃস্থানীয় শিশু-ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু-ক্যান্সার বিভাগের প্রধান প্রফেসর এম এ মান্নানের নেতৃত্বে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, রোটারি ক্লাব অফ জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা মেট্রোপিলিটনের বেশ ক’জন সদস্য এবং সমাজের বেশ কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তি হাতে হাত রেখে অঙ্গীকারবদ্ধ হন। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু-ক্যান্সার ওয়ার্ডে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিভাবে আর্থিকভাবে সহায়তা করে শিশুদের ক্যান্সার চিকিত্সা চালিয়ে নেবেন। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের দীর্ঘ মেয়াদী চিকিত্সায় বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় হয় বলে এই উদ্যমী মানুষেরা ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্লাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এরই ধারাবাহিকাতায় বাংলাদেশ চাইল্ডহুড ক্যান্সার সোসাইটি(বিসিসিএস) নামে একটি অলাভজনক সংগঠন ২০০৭ সালের ২৪ জানুয়ারি সমাজ কল্যাণ বিভাগে নিবন্ধিত হয়।
 
এ সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিশু ক্যান্সার বিভাগে বাংলাদেশের একমাত্র স্বীকৃত ও সুসংগঠিত শিশু ক্যান্সার চিকিত্সা কেন্দ্র। এ চিকিত্সা কেন্দ্র থেকে প্রতিবছর ৫শ’ থেকে ৬শ’ শিশু চিকিত্সা সেবা পেয়ে আসছে বলে জানান বাংলাদেশ চাইল্ডহুড ক্যান্সার সোসাইটির সংশ্লিষ্টরা ।
 
ইত্তেফাক/এএম