‘নেতৃত্ব চাই যক্ষ্মা নির্মূলে, ইতিহাস গড়ি সবাই মিলে’— এই প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হলো বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস-২০১৮। দিবসটি উপলক্ষে ছিল শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সরকারি- বেসরকারি নানা আয়োজন। এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘দি চেস্ট এন্ড হার্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. বিশ্বাস আক্তার হোসেন বলেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনটিপি) তথ্য অনুয়ায়ী ২০১৭ সালে দেশে ২ লাখ ৪৪ হাজার ২০১ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে তাদের চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ১৮৯ জন। দেশে এখন এক্সটেনসিভলি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট রোগীর সংখ্যা মাত্র ১২ জন।
তিনি আরো বলেন, এ রোগটি মূলত পিছিয়েপড়া ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেশি প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে, সেইসব জনগোষ্ঠীর যক্ষ্মার ঝুঁকি বেশি যাদের পানযোগ্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই এবং যারা অনুন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। তা ছাড়া যারা তামাক এবং অ্যালকোহলে অভ্যস্ত তাদের এ রোগে আক্রান্তের সম্ভাবনা বেশি। শহরে ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। শহরে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বারোপ প্রয়োজন। বিশেষ করে, বস্তি এলাকা, ভাসমান জনগোষ্ঠী, কলকারখানা, কারাগার এবং প্রাইভেট সেক্টরে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি আরো সম্প্রসারণ প্রয়োজন। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো হলো শিশু যক্ষ্মা শনাক্তকরণে জটিলতা, নগরে যক্ষ্মা রোগ শনাক্তকরণের হার, বয়স্ক জনগোষ্ঠী, কর্মজীবী পুরুষ, আধুনিক ডায়াগনসিসের ক্ষেত্রে জিনএক্সপার্ট মেশিনের স্বল্পতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে জনবল সংকট, বেসরকারি পর্যায়ে সম্পৃক্ততার অভাব, শনাক্তকরণকে বাধ্যতামূলক না করা ইত্যাদি।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশে যক্ষ্মা চিকিত্সার ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বা এমডিআর নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এখনো এ ধরনের রোগীদের আনুমানিক ৮০ শতাংশই থাকছেন শনাক্তের বাইরে। সকল ধরনের যক্ষ্মায় চিকিত্সার আওতাবহির্ভূত থাকছেন ৩৩ শতাংশ রোগী। সরকারের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রতিবছর ২৪ মার্চ সারাবিশ্বে যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়ে থাকে। যক্ষ্মা রোগের ক্ষতিকর দিক বিশেষ করে স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এ দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। মূলত ১৮৮২ সালের এ দিনে ড. রবার্ট কোচ যক্ষ্মার জীবাণু আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি এ রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের পথ উন্মোচন করেন। তাকে স্মরণ করেই এ দিনটিতে যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্ণয় ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিরই সাফল্য। এ কর্মসূচির মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের হার প্রতি এক লাখ জনসংখ্যায় ৭৭ জন এবং আরোগ্যের হার ৯৫ শতাংশ। বিশ্বে যক্ষ্মার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ ঝুঁকি মোকাবিলা ও যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে বলে জানান তারা।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মোহাম্মদ হিরনের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খাইরুল আনাম প্রমুখ।
ইত্তেফাক/নূহু