রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে এখনো কাজে ফেরেনি অর্ধেক শ্রমিক :অ্যাকশন এইডের গবেষণা
ইত্তেফাক রিপোর্ট
২০১০ সালের পর এ পর্যন্ত গার্মেন্টস খাতে তিন দফায় মজুরি বেড়েছে ২৮৭ শতাংশ। তা সত্ত্বেও এ খাতের শ্রমিকদের বাঁচার মত মজুরি নিশ্চিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিন দফা মজুরি বাড়লেও শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান বাড়েনি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে রানা প্লাজা ধসের ছয় বছর পর গার্মেন্টস খাতের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের আয়োজনে ওই সংলাপে শ্রমিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ ও গার্মেন্টস খাত বিশেষজ্ঞরা, উন্নয়ন সহযোগী, বিদেশি রাষ্ট্রদূত তাদের মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশে অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর এতে সভাপতিত্ব করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মজুরি বাড়লেও শ্রমিকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়নি। এখনো ৮৪ শতাংশ শ্রমিককে রান্নাঘর ও বাথরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। ১৭ শতাংশ শ্রমিককে এখনো ফ্লোরে ঘুমাতে হয়।
এ সময় বিআইডিএস এর সিনিয়র গবেষণা ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, সম্প্রতি ৫ হাজার ৩শ’ টাকা থেকে মজুরি বেড়ে ৮ হাজার টাকা হওয়ার পর মূল্যস্ফীতি হিসেবে নিলে দেখা যায়, প্রকৃত অর্থে মজুরি বেড়েছে মাত্র একশ’ টাকা।
রানা প্লাজার পর গার্মেন্টস খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, ছয় বছর পর এসে তাতে গতি মন্থরতা দেখা দিয়েছে বলেও অভিযোগ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, বরং কিছু ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, পুরো কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কাজটি পেছনের দিকে হাঁটছে। কোথাও এমন ইঙ্গিত যে, আমরা আগেই ভালো ছিলাম। এ সময় রপ্তানি পণ্যে ক্রেতার আয়ের হার বাড়েনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধসের আগে পোশাক সরবরাহকারীর আয়ের হার আর বর্তমানের আয়ের হার একই রয়ে গেছে। সরবরাহ চেইনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এ বিষয়ে মনযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংস্কার কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স চলে যাওয়ার পর তা পর্যবেক্ষণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতায় এখনো ঘাটতি রয়েছে বলেও মত দেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময় ঢাকায় নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের প্রতিনিধি বলেন, অ্যাকর্ডের কার্যক্রম দ্রুত হস্তান্তর করতে হলে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড ও ক্রেতার মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। একই সঙ্গে পোশাকের ন্যায্য দর নিশ্চিত করতে ব্র্যান্ডগুলোকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকায় ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত বলেন, শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ শ্রম ইস্যুতে সামাজিক সংলাপে সবচেয়ে ভালো ফল দিতে পারে।
বাংলাদেশে আইএলও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পুটিআইনেন বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা থাকতে হবে। তা সত্ত্বেও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের যথাযথ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে কাঠামোগত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
রানা প্লাজায় আহত ৫১% শ্রমিক কাজে নেই
রানা প্লাজা ধসের ছয় বছর পর দেখা গেছে, আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৫১ শতাংশ কোনো কাজ করছে না। বাকী ৪৯ শতাংশ গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। অ্যাকশন এইডের সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। আহত হওয়া ২শ’ শ্রমিকের উপর জরিপ কাজ চালিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে অ্যাকশন এইডের প্রতিনিধি নুজহাত জেবিন বলেন, যারা কাজে ফিরতে পারেননি তাদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ শারিরীক দুর্বলতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া আহতদের মধ্যে ২০ দশমিক ৫ শতাংশের অবস্থার অবনতি ঘটেছে, ৫১ শতাংশের অবস্থা স্থিতিশীল ও প্রায় ২৯ শতাংশের অবস্থা সম্পূর্ণ স্থিতিশীল।