সন্তান হারানো ইমামের মাইকিং ঠেকিয়ে দিল আরেকটি দাঙ্গা

আসানসোলের চাঁদমারি ও কুরেশী মহল্লায় মঙ্গলবার সন্ধ্যে থেকে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। সেই এলাকার খানিকটা দূরে নূরানী মসজিদ। সেই মসজিদের ইমাম মুহাম্মদ ইমদাদুল্লাহর ছেলে দুদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। নিখোঁজ ছেলের লাশ বৃহস্পতিবার হাসপাতালে পাওয়া যায়। 
 
দুদিনের হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের জেরে পরিস্থিতি তখনো থমথমে। সবকিছু বন্ধ। চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা গুজব। এর মধ্যই ছেলের ক্ষতবিক্ষত লাশ সনাক্ত করলেন বাবা ইমদাদুল্লাহ। নখ উপড়ে নেয়া হয়েছে। ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের কোপ। লাশটি পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই চিহ্নও আছে। ক্ষত-বিক্ষত লাশটি মহল্লায় আনা হলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। 
 
আসানসোলের চাঁদমারি আর কুরেশী মহল্লা মূলত মুসলমান প্রধান এলাকা। ইমাম ইমদাদুল্লাহ বুঝতে পারলেন, এই প্রতিহিংসা আর বাড়তে দেয়া উচিত নয়। না হয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রাণ যাবে আরও মানুষের। তাই একটা মাইক হাতে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে সবার প্রতি আবেদন জানালেন, ‘আপনারা শান্ত হোন।’
 
ছেলে হারানোর বেদনার মধ্যেও কীভাবে সান্ত্ব রাখলেন নিজেকে। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘এই অবস্থাতেও আমি সবার কাছে আবেদন করতে রাস্তায় বেরিয়েছিলাম- সবাইকে বুঝিয়েছি যে আমার যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা যেন আর কোনও বাপ-মায়ের না হয়। কেউ যেন দাঙ্গা না বাধায় ছেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।’
 
‘ছেলেটা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল, একই সঙ্গে নানা জায়গায় কোরান পড়তেও যেত। বুধবার যখন অশান্তি শুরু হয়, তখন নেহাতই কৌতূহলবশে দেখতে গিয়েছিল। আমার বড় ছেলে খবর দেয় যে একদল লোক ওকে টেনে নিয়ে যায়। পরের দিন জানলাম একটা মৃতদেহ পাওয়া গেছে- ওটাই আমার ছেলের দেহ। খুব যন্ত্রণা দিয়ে মেরে তো ফেলেইছে ছেলেটাকে, তারপরে দেহটা জ্বালিয়েও দিয়েছিল। এটা কেন করল ওরা’-বলেছেন ইমদাদুল্লাহ। 
 
এই ভয়ঙ্কর ঘটনার পরও তার এলাকায় আরও দাঙ্গা অথবা কোনোরকম সাম্প্রদায়িক অশান্তি রোধ করা গেছে। ওই পাড়ায় হিন্দু আর মুসলমান পরিবারগুলো বহু বছর ধরেই যেমন একসঙ্গেই বাস করছেন, তেমনই সেখানকার মন্দির বা মসজিদ- সবই অক্ষত রয়েছে।
 
স্থানীয় বাসিন্দা প্রমোদ বিশ্বকর্মা বলছিলেন, ‘ইমাম সাহেবকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব! ছেলে হারানোর পরেও রাস্তায় মাইক নিয়ে বলে বেরিয়েছেন যে সবাই যেন শান্তি বজায় রাখে। তবে আমাদের এই পাড়াতে আমরা হিন্দু আর মুসলমান সবাই একসঙ্গেই থাকি বহু যুগ ধরে। পাড়ায় একটা মন্দির আছে প্রায় দেড়শা বছরের পুরনো, আবার মসজিদও আছে। বাইরে যা হয় হোক, আমাদের পাড়ায় কেউ ঝামেলা করতে পারে না।’
 
ইত্তেফাক/কেআই