যথাযথ স্থানে তৈরি না হওয়ায় রাজধানীর অনেক ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন না পথচারীরা। আবার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে যেসব ফুট ওভার ব্রিজ আছে সেগুলোর বেশি উচ্চতা, নোংরা পরিবেশ, হকার, ভিক্ষুক, বখাটে ও মাদকসেবীদের দখলে থাকার কারণে রাস্তা পারাপারে এগুলো ব্যবহারে অনীহা দেখা যায় পথচারীদের মধ্যে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারী।
পথচারীরা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ ফুট ওভারব্রিজ যথাযথ স্থানে তৈরি না হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে তারা রাস্তা পার হচ্ছেন। সময় বাঁচাতে ও কষ্ট কমাতে তারা উঁচু ফুট ওভারব্রিজ এবং আন্ডারপাস ব্যবহার করছেন না। আবার এগুলো ব্যবহার করা অনিরাপদ মনে করেন তারা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারের অনুপযোগী। নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য এগুলো উপযোগী নয়, বরং বিপজ্জনক। ফুট ওভারব্রিজের যে উচ্চতা থাকা প্রয়োজন, রাজধানীর ব্রিজগুলোর উচ্চতা তার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় সেগুলো ব্যবহারে পথচারীরা উত্সাহ পায় না। নারী, শিশু, বয়স্ক, বিশেষ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এবং অসুস্থ রোগীদের কথা বিবেচনা করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং হাসপাতাল সংযোগকারী ফুটওভার ব্রিজগুলোকে অটোমেশন করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা কেন্দ্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বছরে চার শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। যার ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে পথচারী রাস্তা পার হতে গিয়ে। গবেষণায় এসব দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পথচারীদের ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এবং পথচারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ফুটওভার ব্রিজগুলোর উচ্চতা বেশি হওয়ায়, এগুলোর নোংরা পরিবেশ, হকার, ভিক্ষুক ও মাদকসেবীদের দখলে তা থাকায় তারা ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন না। নির্জন এলাকার সেতুগুলো পারাপারে দিনের বেলাও অনিরাপদ মনে করেন পথচারীরা। সন্ধ্যার পর ওভারব্রিজে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে এবং বখাটে যুবকরা আড্ডা মিলায়। ফলে নারীরা সেতু ব্যবহারে অনীহা দেখান।
রাজধানীর তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী তামান্না জাহান বলেন, খুব না ঠেকলে নির্জন এলাকার রাস্তা পারাপারে সেতু ব্যবহার করি না। সন্ধ্যার পর অনেক ওভারব্রিজ থাকে অন্ধকার। তাই ঝুঁকি হলেও গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে রাস্তা পার হই।
ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মিরপুর, শ্যামলী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ওভারব্রিজগুলো ব্যস্ত থাকলেও এগুলো হকারের দখলে। নিউমার্কেটের উভয় সেতুর সিঁড়ির উপরেও পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে হকাররা। এর ফাঁক গলে প্রতিদিন চলছে হাজার হাজার পথচারী। অন্যদিকে রাজধানীর ব্যস্তময় এলাকা ফার্মগেট ও কাওরান বাজারে দুটি সেতু এবং একটি আন্ডারপাস থাকার পরও ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয় কাওরান বাজার এলাকার অনেক মানুষ। শাহাবাগ মোড়ে তিনটি এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে একটি ফুট ওভারব্রিজ থাকলেও রোগী ছাড়া খুব কম সংখ্যক লোককে এগুলো ব্যবহার করতে দেখা যায়।
ঢাকায় ৮৯ টি ফুটওভার ব্রিজ আছে। এর মধ্যে নির্জন এলাকার সেতুগুলো ব্যবহার হয় না। কালেভদ্রে দু’একজন পারাপার করেন। এগুলো ছিন্নমূল মানুষের বসবাসের স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এদিকে আন্ডারপাস আছে তিনটি। যার মধ্যে রাস্তা পারাপারে ব্যবহার হয় দুটি। যদিও দুটি পদচারীসেতুতে চলন্ত সিঁড়ি লাগানো হয়েছে। তবে একটি নষ্ট। রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে সংযুক্ত করতে একটি র্যাম্প তৈরি করা হলেও এটি ব্যবহার করতে দেখা যায় না কাউকে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ইসরাত ইসলাম জানান, স্কুলের শিশু এবং হাসপাতালের রোগীদের জন্য রাজধানীর ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করা কঠিন। তবে তাদের এগুলো ব্যবহারে উত্সাহী করতে হবে এবং এগুলো ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে। অন্যদিকে তরুণদের অবশ্যই ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে। এতে শহরের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে।
ইত্তেফাক/নূহু