বরকতুল্লাহ সুজন
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, সিরিয়া যুদ্ধ নিজ দেশে অর্থনৈতিক সমস্যার কষাঘাতে জীবন বাজি রেখে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে প্রতি বছর ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে লাখো শরণার্থী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন ভয়াবহ শরণার্থী সংকট দেখেনি বিশ্ববাসী। পরিসংখ্যান বলছে, এ কয় বছরে দু’শ’ বাইশটি সংঘাতে উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় সাত কোটি মানুষ। যাদের বায়ান্ন শতাংশই শিশু। এ অবস্থায় সংকট সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ। বিশ্বব্যাপী অভিবাসন সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়ে গত জুলাইয়ে খসড়া চুক্তির অনুমোদনও দেয় জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশ। আগামী ১০ ডিসেম্বর মরোক্কোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে সই করার কথা রয়েছে দেশগুলোর। তবে এরই মধ্যে চুক্তি না করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর এই বিরোধিতার সুরে কণ্ঠ মিলিয়েছে আরো কয়েকটি মিত্র দেশ। এই ইস্যুতে পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে পশ্চিমা বিশ্ব।
তবে অভিবাসন চুক্তির পক্ষে সবচেয়ে বেশি জোর গলায় কথা বলছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। জাতীয়তাবাদীদের হুমকি-ধমকি সত্ত্বেও শুরু থেকেই তিনি শরণার্থীদের স্বার্থে কথা বলে আসছেন। এই ইস্যুতে ক্ষমতার ভিত্তি নড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে মার্কেলের। তবে তা বরাবরই সব হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে চলেছেন মার্কেল। আবেগাপ্লুত ভাষায় মার্কেল পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন, কেন তিনি জাতিসংঘ চুক্তির পক্ষে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিজ দেশের চরম ডানপন্থি জাতীয়তাবাদীদের কঠোর সমালোচনাও করেন তিনি। মার্কেল বলেন, পৃথিবীতে এমন বহু লোক আছে, যারা নিজেরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন বলে মনে করেন। কিন্তু অন্য কেউ সমস্যার সমাধান করুক, এটা তারা চান না। তিনি বলেন, জার্মানির নিজস্ব স্বার্থেই শরণার্থী সমস্যার সমাধান করতে হবে। আর এটা মোটেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন নয়। তবে চুক্তি সইয়ের আগে এই ইস্যুতে বড় পরিসরে বিতর্কের দাবি জানিয়েছেন খোদ রক্ষণশীল জোটের নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেন্স স্পান। যিনি চ্যান্সেলর পদে মার্কেলের ঘর-শত্রু বলে পরিচিত। সরাসরি বিরোধিতা করছে কট্টর ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি- এএফডি। তারা মনে করে, কোন দেশের একার পক্ষে যেহেতু এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়, তাই এর সমাধান আন্তর্জাতিকভাবেই হওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার পর ইসরাইলও জাতিসংঘ চুক্তির ঘোর বিরোধিতা করছে। যদিও বিশ্ব রাজনৈতিক পেক্ষাপটে বর্তমান শরণার্থী সংকট তৈরিতে এ দুই দেশের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা নেহাতই কম নয়। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ওয়াশিংটন নীতিগতভাবেই যেখানে অভিবাসীদের ব্যাপারে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে, সেখানে নতুন করে কোনো চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে না। সার্বভৌম যে কোনো দেশেরই বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা প্রাথমিক দায়িত্ব বলেও মনে করে ওয়াশিংটন। অস্ট্রেলিয়াও জানিয়েছে তাদের বিরোধিতার কথা। অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন মনে করেন, ভালো চোখে দেখলেও এই মুহূর্তে জাতিসংঘ চুক্তিটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থি। এর আগে, গত অক্টোবরে তুলনামূলক কঠোর অভিবাসন নীতি ঘোষণা করে দেশটি। যার তীব্র সমালোচনা করে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সাধারণত কেউ নৌকায় অবৈধভাবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করলে তাকে পাঠানো হয় নাইরু বা পাপুয়া গিনির মেনাস দ্বীপে। যেখানে বন্দিদশায় থাকতে হয় অভিবাসী প্রত্যাশীদের। তীব্র হতাশার কারণে এক পর্যায়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেন কেউ কেউ। জাতিসংঘেরই এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য উঠে এসেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে এই চুক্তি সই থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছে হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়া। এ কারণে নিজেদের অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছে এ দুই দেশ। শান্তির দেশ সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, মরোক্কোতে আগামী মাসে জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছে না তারা। কারণ চুক্তি সইয়ের আগে আইন অনুযায়ী পার্লামেন্টে বিতর্ক ও অনুমোদন প্রয়োজন, যেটা এখনও হয়নি। তাই বিষয়টি আপাতত অপেক্ষমাণ। তবে সুইস ফেডারেল কাউন্সিল জানিয়েছে, জাতিসংঘ চুক্তিটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
জাতিসংঘের এই চুক্তিকে বলা হচ্ছে নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক ও নিয়মিত অভিবাসনের বৈশ্বিক চুক্তি। যার লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসন কমিয়ে আনা, অভিবাসী সমন্বয় ও তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সাহায্য করা। এ লক্ষ্যে সহযোগিতার একটি কর্মকাঠামোই হচ্ছে ওই চুক্তি। জাতিসংঘের এক বছরের প্রচেষ্টার ফসল এই বৈশ্বিক চুক্তির খসড়া। যা চূড়ান্ত হয় গত জুলাইয়ে। যেখানে সংকট সমাধানে রাখা হয়নি কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা।