প্রজন্ম মেতেছে অ্যাডভেঞ্চারে

>> সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

 

বছর দশক আগে কোথাও ঘুরতে যাওয়া বা ভ্রমণ মানেই ছিল স্রেফ ছুটি কাটানো। সমুদ্রসৈকত, পাহাড় বা নদীর তীরে বসে বিশ্রাম নেওয়া আর অলসভাবে প্রকৃতির সঙ্গ উপভোগ করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল ভ্রমণ। ছুটিতে দেশের বাইরেও যেতেন অনেকে। সেখানেও কোনো হোটেল বা রিসোর্টে সময় কাটানো, শপিং সেন্টারে ঘুরে ঘুরে শপিং করাই ছিল ভ্রমণের উদ্দেশ্য। এখন ভ্রমণের সেই ধরন পাল্টে গেছে। বদলে গেছে ট্যুরিজম বা পর্যটনের ধারণাও। আজকাল তরুণেরা প্রথাগত পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অলসভাবে বসে থাকার জন্য যান না। বরং এখন ছুটি কাটে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরে গিয়ে, যার মাধ্যমে তারা পাহাড়ে নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করেন, ঝরনার পানির উত্স খোঁজেন, ঢুকে পড়েন গহীন অরণ্যে। আগে যারা ছুটি পেলেই দেশের বাইরে চলে যেতে চাইতেন, তারাও এখন ভাবেন সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর দেখবেন কিংবা স্নান করবেন নীলাদ্রির স্বচ্ছ জলে। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অনেকেই সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে বাড়তি হিসেবে এক-দুই দিন বেশি পেলেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে বের হন। আবার একদল তরুণ আছেন, যারা নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কারের নেশায় সারাবছরই দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান। এতে করে বাড়ছে পর্যটনশিল্পের প্রসার। পাশাপাশি ভ্রমণে মানুষকে উত্সাহ জোগাচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশকিছু গ্রুপ ও পেজ তৈরি হয়েছে, এদের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা বিভিন্ন এলাকায় তাদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতার আদ্যোপান্ত তুলে ধরছেন। শেয়ার করা হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দারুণ সব ছবি। নতুন কোথাও যেতে চাইলে কীভাবে যেতে হবে, কেমন খরচ হবে—এমন প্রশ্নের উত্তরও মিলছে ফেসবুকে। এসব কারণেই ভ্রমণে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব, ট্যুরিস্ট ক্লাব গড়ে উঠেছে। এসব ক্লাবের সদস্যরা সময় পেলেই দলবেঁধে ঘুরতে যাচ্ছেন।

এখন পরিচিত ও নির্দিষ্ট কিছু জায়গার বাইরেও ঢাকার অদূরে দোহারের মৈনাক ঘাট, পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি, হাজাছড়া বান্দরবানের বগা লেক, থানচির নাফাখুম, নীলগিরি ঘুরতে যাচ্ছেন অনেকেই। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, শিমুল বাগান, শহীদ সিরাজ লেক, শ্রীমঙ্গলের হামহাম ঝরনা, সিলেটের রাতারগুল, মায়াবন, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজার, রাঙামাটির বিলাইছড়ির ধুপপানি ঝরনা, মুপ্পোছড়া ঝরনা খুব বেশিদিন আগেও পরিচিত ছিল না। কিন্তু তরুণ ভ্রমণপ্রেমীদের কল্যাণে এই জায়গাগুলোর পরিচিত বেড়েছে। এখন এগুলো পর্যটকদের আনাগোনায় মুখর।

পর্যটন খাতে কাজ করছে, এমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা গেল, পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানে আছে কক্সবাজার। কক্সবাজারে বিশ্বের বৃহত্ সমুদ্রসৈকত দেখতে অসংখ্য পর্যটক ভিড় করেন। দ্বিতীয় স্থানে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যান পর্যটকরা। তৃতীয় স্থানে আছে বৃহত্তর সিলেট। চা-বাগানসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন পর্যটকরা। এ ছাড়াও সুন্দরবন, কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিন, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় প্রভৃতি স্থানের কথা সবার জানা। পর্যটনখাতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ভিতরে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহ বাড়ছে। বিদেশ থেকেও পর্যটক আসছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। বিদেশিদের কাছে দেশকে আরও বিশদভাবে তুলে ধরতে হবে। মূলত এ সময়ের তরুণেরা এই প্রচারের কাজ করছেন। সরকারকেও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সরকারিভাবে দেশে পর্যটনশিল্পের প্রসারে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড কাজ করে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, পর্যটনের প্রসারে ও অবকাঠামোর উন্নয়নে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগেরও সংশ্লিষ্টতা আছে। সবাইকে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ একটা পর্যটনকেন্দ্রকে মানসম্মত অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ভালোমানের পরিবহন, পাবলিক টয়লেট, হোটেল-রেস্টুরেন্ট গড়ে তুলতে হবে।

তবে তরুণেরা আর আজকাল আগের মতো প্রথাগত ভ্রমণে বের হন না। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে অ্যাডভেঞ্চার করার বা নতুন স্বাদ নেওয়ার। তাই আনাচা-কানাচে ঘুরে বেড়িয়ে বিভিন্ন নতুন স্থান খুঁজে বের করছেন তারা। কেউ কেউ সাইকেল চালিয়ে পুরো দেশ ঘুরছেন। কেউ দৌড়ে দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত স্পর্শ করছেন। আবার কেউ কেউ অ্যাডভেঞ্চার নেশায় শুধু দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে যাচ্ছেন বিদেশেও। উত্তাল সমুদ্র বা পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। যারা কর্মজীবী, তাদের বেলায় এই ভ্রমণ হয়তো অর্থের জোগান দেয় না; কিংবা যারা শিক্ষার্থী, তাদের পরীক্ষার খাতায় বাড়তি নম্বর যুক্ত হয় না; কিন্তু মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিণত করে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়ানোর পর মনে এনে দেয় উচ্ছ্বাস।

দেশের দুর্গম জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়ান ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের সদস্যরা

 

দেশের সবচেয়ে বড় ভ্রমণবিষয়ক ফেসবুক গ্রুপ ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (টিওবি)। এখন পর্যন্ত গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা সাড়ে ৯ লাখের বেশি। আর এই সংখ্যা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। যারা এর সাথে যুক্ত আছেন, তারা সবাই ভ্রমণ ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। এদের কেউ কোথাও ঘুরতে গেলে ফিরে এসে নিজেদের অভিজ্ঞতা লিখে শেয়ার করেন এই গ্রুপে। তবে গ্রুপের অ্যাডমিন যারা আছেন, তারা অহেতুক বা অপ্রয়োজনীয় পোস্ট যাচাই-বাছাই করে বাদ দেন। এ ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরকে ‘ঝাড়ুদার’ বলে পরিচয় দেন! কারণ কাজটা নাকি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতোই। তবে ভার্চুয়াল জগতে নয়, তারা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্ব পালন করছেন বাস্তবেও! দলবেঁধে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় গিয়ে অপচনশীল জিনিসপত্র কুড়িয়ে আনেন। পরিচালনা করেন পরিচ্ছন্নতা অভিযান। আট-দশ বছর আগেও ব্যাকপ্যাকিং, ক্যাম্পিং, ট্র্যাকিং দেশে এখনকার মতো জনপ্রিয় ছিল না। বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে বা কোনো ঝরনার পাশে রাত কাটানোর কথা ভাবেনি কেউ। আবার ঘুরে বেড়ানোর প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকলেও ভ্রমণপ্রেমী সঙ্গীর অভাবে ঘুরতে যেতে পারতেন না অনেকেই। ফলে, অনেকেরই ছুটি কাটত রিসোর্টে বা পার্কে ঘুরতে গিয়ে। ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ বা টিওবির জন্মের পর প্রচুর ভ্রমণপ্রেমী মানুষ সমমনা সঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন। এখন তো নতুন কিছুর খোঁজে নতুন জায়গা, নতুন বসতি, নতুন বন, নতুন পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রচুর মানুষ। টিওবির অ্যাডমিন তানভীর মৃদুল জানান, এটির প্রতিষ্ঠাতাদের বিশ্বাস ছিল, তারা এমন একটা প্লাটফর্ম গড়ে তুলবেন, যা নতুন বা না-দেখা স্থানগুলোর কথা জানান দেবে, তৈরি করবে ভ্রমণের স্পৃহা। ফেসবুক থেকে বেরিয়ে প্রতিবছর নানা উদ্যোগ নেয় ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের সদস্যরা। শুধু নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রে বাস-ট্রেন বা গাড়িতে করে যাওয়ার প্রথাগত ভ্রমণ নয়, ভ্রমণের সব রকমের স্বাদ গ্রহণ করতে প্রতিবছরই অসংখ্য ইভেন্ট করে দলটি। ২০১৪ সালে দলটির প্রথম পুনর্মিলনীটি হয়েছিল গাজীপুরে মৌচাকের স্কাউট মাঠে। সেবার প্রায় ১৫০ জন তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিযাপন করেছেন সেখানে। আবার কখনো ক্যাম্পিংসহ পর্বতারোহণের মতো নানা রোমাঞ্চকর আয়োজনের। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, গতবছরের ‘ম্যাডভেঞ্চার’ ইভেন্টটি। সাইক্লিং, সি-কায়াকিং, ম্যারাথন, স্কেটিং ছাড়াও নানা আয়োজনে ভরপুর ছিল ইভেন্টটি। টিওবির সদস্যরা বললেন, ‘আমরা এমন ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন আগামীতে আরও করব। এর মাধ্যমে ভ্রমণের আসল আনন্দটা উপভোগ করা যায়। ভ্রমণ নিয়ে প্রকাশনাও বের করেছে টিওবি। ‘ভ্রমণ কথামালা’ ও ‘আমার ভ্রমণ কথামালা’ নামে তিনটি সংকলন প্রকাশ করেছে। এক দশক আগে যারা এই দলটির সঙ্গে ছিলেন, তাদের অনেকেই বিদায় নিয়েছেন। তবে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন নবীনদের হাতে। এভাবেই গ্রুপটি সচল আছে। পর্যটকদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে চমত্কার প্লাটফর্ম হিসেবে।

 

ভ্রমণপিপাসু নারীদের ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ

ঘুরে বেড়ায় সারাদেশ

 

পরীক্ষা শেষে দলবেঁধে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। কিছুদিন আগেও এই কাজটাতে যেন শুধু ছেলেদেরই একক কর্তৃত্ব ছিল! ছুটিতে মেয়েদের সময় কাটত ঘরে বসে সিনেমা দেখে, একঘেয়েমির মধ্য দিয়ে। ছেলে সহপাঠীদের সাথে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হতো না, আবার মেয়েরাও একসঙ্গে হয়ে কোথাও যাওয়ার জন্য একত্রে হতে পারত না। কিন্তু যারা ভ্রমণপিপাসু, তাদের তো সবসময়ই ইচ্ছা করে ঘুরে বেড়াতে, পাহাড়-প্রকৃতি দেখতে। মেয়েদের জন্য এমন সুযোগ করে দিতেই যাত্রা শুরু হয় দেশের প্রথম নারী ট্রাভেলার্স গ্রুপ ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের। এই সংগঠনের পথপ্রদর্শক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করা স্বপ্নবাজ দুই তরুণী সাকিয়া হক ও মানসী সাহা। এই দুই বন্ধুর উদ্যোগেই ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর ফেসবুকে ট্রাভেলেটসের গ্রুপের জন্ম হয়। এখন এটি ভ্রমণপ্রিয় নারীদের বিশাল এক পরিবার। দেশ ও দেশের বাইরের দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের সদস্যরা। গেল বছরের জানুয়ারিতে নরসিংদীতে ছিল এ গ্রুপের প্রথম ট্যুর। সেবার অংশ নেন ১৯ জন নারী। মেঘনা নদী ভ্রমণ, দিগন্তবিস্তৃত সরিষা খেতে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলা, বস্ত্রকল দেখা—সব মিলিয়ে ভ্রমণের গল্প এতটাই আকর্ষণীয় হয়েছিল যে তা ফেসবুক গ্রুপে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরের ট্যুরে ঢাকার দোহারে ৩০ জন যাওয়ার কথা থাকলেও যোগ দেন ৫১ জন। বাস ভাড়া নিয়ে পূর্ণিমার রাতে বেড়িয়ে পড়েন তারা। জানা গেল, প্রচুর পরিকল্পনা তাদের। নারীদের দলগুলো ছুটছে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়। তারা যে শুধুই ঘোরাঘুরি করছে তা নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ক্যামেরায় ধারণ করা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃশ্য নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীরও আয়োজন করছে। উদ্দেশ্য, দেশের দৃষ্টিনন্দন জায়গার ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে নারীদের ভ্রমণে উত্সাহিত করা। স্বল্প সময়ের মধ্যেই গ্রুপটি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কর্তৃক সেরা ২০ অনলাইন ট্রাভেলিং গ্রুপের তালিকায় স্থান পেয়েছে। নারী হওয়ার পাশাপাশি গ্রুপে যোগ দেয়ার আরেকটি শর্ত, গ্রুপে নিজের পরিচয়মূলক পোস্ট দেওয়া। কারণ এতে সহজেই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, এমনটাই মনে করেন মানসী সাহা। তবে ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ গ্রুপের সঙ্গে ঘুরতে গেলে কড়াকড়ি নিয়ম হলো, ‘কোথাও ঘুরতে গিয়ে পরিবেশ নোংরা করা একদমই চলবে না। ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না।’ এবছর সিআরআই কর্তৃক জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে এই গ্রুপ। এটি এখন আর কেবল গ্রুপ নয়, সংগঠনও। সাকিয়া বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসে বিভিন্ন ট্যুর প্ল্যান করে থাকি। দেশে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করি। সেখানকার স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া হয়। এটা পর্যটনের অন্যতম অংশ। আমাদের একেকটি ট্যুরে ২০-৭০ জন নারী থাকেন। বিভিন্ন বয়সী নারীরা অংশ নেন। সবাই মিলে আনন্দ উপভোগ করি।’

 

সাইকেলে চড়ে আসাদের বিশ্বভ্রমণ

 

গোপালগঞ্জের টগবগে যুবক আসাদ হোসেন আসাদ, যিনি বেশি পরিচিত ‘সাইক্লিস্ট আসাদ’ নামেই। এরমধ্যেই সাইকেল চালিয়ে পৃথিবীর প্রায় অর্ধশত দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। দেশ-বিদেশ ঘুরে দেখেছেন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, উপভোগ করেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দেখেছেন নানা রঙের মানুষ। শুধু তাই নয়, মূলত পরিবেশ দূষণ, পর্যটনশিল্পের বিকাশ, এইডস প্রতিরোধ, মাদক নির্মূল, দুর্নীতি রোধসহ নানা সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা তৈরির বার্তা নিয়েই ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। তবে, এ পথে নামার পিছনে একটা গল্প আছে। ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে সিলেটের লাক্কাতুরায় স্কাউটের রোভারমুটে অংশগ্রহণ করতে রওনা হয় মেহেরপুর ডিগ্রি কলেজের পাঁচ শিক্ষার্থী। পথে মানিকগঞ্জে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ওই পাঁচ শিক্ষার্থী। ঘটনাটা আসাদকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। এরপর নিরাপদ সড়ক চাই এবং পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়—এই বাণী ছড়িয়ে দিতে পথে নামলেন তিনি। সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখলেন। দেশের প্রতিটি বিভাগে ছুটলেন। তখনো তিনি ছাত্র। দেশ ঘোরার পর ঠিক করলেন—এবার পুরো পৃথিবীটাই ঘুরবেন! সাইকেলে করেই প্রথম ভ্রমণ করেন ভারতে। একে একে ৪২টি দেশে পা ফেলেছেন তিনি। সবশেষে ভ্রমণ করেছেন ওমানে। সাইকেলে চড়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশের সীমান্ত পাড়ি দিতে বহু ঝক্কি-ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এত পথ ঘোরার পরও তিনি মনে করেন, পৃথিবী ঘোরার তো সবে শুরু হলো!

আসাদের বাবার নাম আবদুল আলী ফকির, মা রহিমা বেগম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে এমএসসি করেছেন। গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের বনগ্রামে তার জন্ম। পথিক লিমিটেড নামের ট্যুরিজম অপারেটর প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। দেশে ও দেশের বাইরে যেখানেই যান, সেখানেই প্রচার করেন সমাজ সচেতনতামূলক বাণী। ‘স্থলমাইনমুক্ত পৃথিবী’, ‘দুর্নীতিমুক্ত স্বদেশ’, ‘মাদককে না বলো, জীবনের পথে এগিয়ে চলো’, ‘পরিবেশ বাঁচান, নিজে বাঁচুন’, ‘এইচআইভিমুক্ত বিশ্ব গড়ি’—এসব শ্লোগান নিয়ে ভবিষ্যতেও কাজ করে যাবার প্রত্যাশা তার।

 

সাইকেলে চড়ে পুরো দেশ ঘুরেছেন ইতি

 

ঠাকুরগাঁওয়ের তরুণী সিফাত ফাহমিদা ইতির ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল। যখন ক্লাস থ্রি-তে পড়েন, তখনই শিখে ফেলেন সাইকেল চালানো। সাইকেল নিয়ে প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে যেতেন এদিক ওদিক। একবার সাইকেল চালাতে চালাতে ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুর চলে গিয়েছিলেন, সেসময়ই তার মাঝে তৈরি হয় ভ্রমণের নেশা। ২০০৮ সালে একবার পত্রিকায় নারী দিবস উপলক্ষে সাইকেল র্যালি আয়োজনের খবর দেখলেন। দেখামাত্রই ভাবলেন এতে তিনি অংশ নেবেন। চলে এলেন ঢাকায়। সেই র্যালিতে অংশ নেওয়াই ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রথম সাইক্লিং। এভাবে ধীরে ধীরে সাইক্লিংয়ে সম্পৃক্ত আরও অনেকের সাথে পরিচয় হয়। ২০১১ সাল থেকে সাইকেলে চড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন ইতি। গেলবছর ভ্রমণপিপাসুদের খ্যাতনামা সংগঠন ভ্রমণ বাংলাদেশের সদস্যদের সঙ্গে পূজার ছুটিতে পুরো দেশ ঘোরার লক্ষ্য নিয়ে বের হন। সঙ্গী হন আরও দুই সাইক্লিস্ট রবিউল হাসান খান ও মাহফুজুর রহমান। সেবার সিফাত ফাহমিদা ইতি একযোগে সাইকেলে চড়ে ঘুরেছেন পুরো দেশ। প্রায় তিন সপ্তাহের সাইকেল ভ্রমণে ঘুরে এসেছেন দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। ইতি জানান, অন্যান্যবারের চেয়ে এবারের ভ্রমণ অনেক কঠিন ছিল। অল্প সময়ে অনেক বেশি জায়গা ঘুরেছেন, অনেক জায়গায় প্রচণ্ড খারাপ রাস্তাতেও সাইকেল চালিয়েছেন তারা। এরমধ্যে বৃষ্টিতেও ভিজতে হয়েছে। আলাপে জানা গেল, ভ্রমণপিয়াসু এই তরুণী পর্বতারোহণ ও সাঁতারেও পারদর্শী সমানভাবে। ইচ্ছা ও উদ্যম তার শক্তি। পরিবারের সবার সহযোগিতা ও উত্সাহ থেকেই পান অনুপ্রেরণা। ইতি বলেন, ‘দেশে বিভিন্ন এলাকাতেই সাইক্লিস্ট কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। আর দৈনন্দিন জীবনে সহজে চলাফেরার জন্য চমত্কার বাহন সাইকেল। ঢাকা শহরে অনেকেই এখন সাইকেলে চড়ে অফিস করেন। এটি যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি যানজট কমাতে সহায়ক।’ ইতি বেশকিছু দিন আগে মুসা ইব্রাহিমের আয়োজন করা ইভেন্ট ট্রায়াথনে ভালো করে পর্বতারোহণে যাওয়ার সুযোগ পান। নেপালের চুলু ইস্ট, রাশিয়ার এলব্রুস অভিযান করেছেন। ভবিষ্যতে কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ আরও অনেক শৃঙ্গ ছুঁতে চান তিনি। পাশাপাশি সাঁতরে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ারও ইচ্ছা উদ্যমী এই তরুণীর।

 

দৌড়-সাঁতার-সাইক্লিংয়ে সমানভাবে পারদর্শী আরাফাত

 

নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার মুসাপুর গ্রামের তরুণ মোহাম্মদ সামসুজ্জামান আরাফাত দৌড়ে, সাঁতারে ও সাইক্লিংয়ে সমানভাবে পারদর্শী। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ১০০৪ কিলোমিটার দৌড়ে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। চারবার সাঁতারে পাড়ি দিয়েছেন বাংলা চ্যানেল। অংশ নিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ম্যারাথনে। শুধু দৌড় ও সাঁতার নয়, ভালোবাসেন সাইক্লিংও। আরাফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। বাবা নোয়াখালীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন ও মা বিলকিস আরা বেগম। ছোটবেলা থেকেই ঘুরে বেড়ানো ও দুরন্তপনার নেশা আরাফাতের। আর সেই নেশা থেকেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকে। শুধু তাই নয়, এরমধ্যেই তার নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের ‘আয়রনম্যান’ খেতাব। গেল বছর অনুষ্ঠিত ঢাকা চ্যালেঞ্জ-এর ট্রায়াথলনে তিনি বাঙালি প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রথম ও সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয় হন। পরে তিনি বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে মালয়েশিয়ায় অংশ নেন পৃথিবীর কঠিনতম আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায়। সেখানে বিভিন্ন দেশের মোট ১০০৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ২৭৪তম হন। আরাফাত জানান, আগামী জুনে আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এই ইভেন্ট বিশ্বের কঠিন খেলাগুলোর একটি, যেখানে প্রতিটি প্রতিযোগীকে প্রথমে ৩.৮ কিলোমিটার সাঁতরাতে হয়, তারপরই ১৮০ কিলোমিটার সাইকেল এবং শেষে ফুল ম্যারাথন (৪২.২ কিলোমিটার) দৌড়াতে হয়। কাজটুকু করতে হয় ১৭ ঘণ্টার মধ্যে। গেল আসরে আরাফাত এই কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেন মাত্র ১২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে। আরাফাত জানান, মানুষকে রানিং ও অ্যাকটিভ লাইফস্টাইলের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে প্রত্যেক জেলায় ১০ কিলোমিটার করে দৌড়ের আয়োজন করছেন। এ ছাড়া তার পরবর্তী মিশন হিসেবে আয়রন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ছাড়াও মিশন ম্যারাথন দেস স্যাবলিসের কথা ভাবছেন, যা সাহারা মরুভূমিতে একদিনের কঠিনতম রেস হিসেবে পরিচিত। ৬ দিনে ২৫০ কিলোমিটার দৌড়াতে হবে সেখানে।

 

পাহাড়-পর্বতে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন শাকিল

 

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচালার গ্রামের তরুণ ইকরামুল হাসান শাকিলের জন্ম কৃষক পরিবারে। গ্রামেই বড় হয়েছেন বলে তার ছোটবেলা ছিল নানা উচ্ছলতায় ভরপুর। ছোটবেলায় সাপুড়ের খেলা দেখে তার ইচ্ছা হয়েছিল সাপুড়ে হবেন। আবার গ্রামে পাড়ার চৌকিদারের প্রভাব, লাঠি হাতে ঘুরে বেড়ানো দেখে ভাবতেন চৌকিদার হবেন। শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের বাগচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন এলাকার জনতা উচ্চবিদ্যালয়ে। পরে ঢাকায় এসে টেক্সটাইলে ডিপ্লোমা করার সময় শুরু হয় অন্য সংগ্রাম। টিউশনি, শোরুমে চাকরি, কখনো মার্কেটিংয়ে চাকরি করে নিজের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হয়েছে। খুব সাদামাটাভাবেই কেটে যাচ্ছিল জীবন। হঠাত্ একদিন ইউটিউবে ঘুরে বেড়ানোর অ্যাডভেঞ্চারের বিভিন্ন ভিডিও দেখতে দেখতে তারও সেরকম কিছু করার আগ্রহ তৈরি হয়। স্বপ্ন দেখলেন পাহাড়-পর্বতের চূড়ায় উঠবেন। যোগাযোগ করলেন এভারেস্ট জয়ী এমএ মুহিতের সঙ্গে। তিনি জানালেন পাহাড়ে উঠতে হলে প্রচুর হাঁটার অভ্যাস থাকতে হবে। কথামত ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার দাবিতে’ কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে পাঁয়ে হেঁটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন শাকিল। দশদিন পর ঢাকায় পৌঁছান। ২০১৪ সালে ভারতের উত্তরখণ্ডের নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে পর্বতারোহণে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে মুহিতের নেতৃত্বে নেপালের ২০ হাজার ২শত ৯৫ ফিট উচ্চতার মাউন্ট কেয়াজুরি পর্বত চূড়া আরোহণ করেন শাকিল। এরপর ২০১৭ সালে ২০ হাজার ৫০০ ফিট উচ্চতার মানাসলো লারকেপিকে অভিযান করেন। এবছর পর্বতারোহণে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৮ হাজার ৭শত ১১ ফিট উচ্চতার ধ্রুপদীকা ডান্ডা পর্বত অভিযান করেন। পৃথিবীতে ২৬ হাজার ফুট উচ্চতার ১৪টি পর্বত রয়েছে। সবগুলো পর্বত আরোহণ করা শাকিলের স্বপ্ন। এ ছাড়া পর্বতারোহণ নিয়ে ‘মাউন্ড কেয়াজুরির শিখরে বাংলাদেশ’ ও কলকাতা থেকে ঢাকায় পায়ে হাঁটার গল্প নিয়ে ‘পদ চিহ্ন এঁকে যাই’ নামক দুটি বই প্রকাশ হয়েছে তার।