আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর ল্যাটিন আমেরিকার ডমিনিক্যান রিপাবলিকের স্বৈরাচারী শাসক রাফায়েল ক্রজিলোর বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত বিদ্রোহ করায় প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মিনার্ভা মিরাকেল নামের তিন বোনকে হত্যা করা হয়। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে ১৯৮১ সালে ল্যাটিন আমেরিকার নারীদের এক সম্মেলনে ২৫ নভেম্বরকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকার সম্মেলনে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২৫ নভেম্বর ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্যা ইলিমিনেশন অব ভায়োলেন্স এগেইনষ্ট উইমেন’ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে পক্ষকালব্যাপী এই আয়োজনের উদ্যোক্তা উইমেন এইড ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক পিদা রিপ্লে। তিনি এই আয়োজনের নাম দেন ‘সিক্সটিন ডেজ অব অ্যাকটিভিশন এগেইনষ্ট জেন্ডার ভায়োলেন্স।’ পক্ষকালব্যাপী এই আয়োজনে স্থান করে নেয় ‘হোয়াইট রিবন ক্যাম্পেইন’। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কানাডিয়ান একজন পুরুষের উদ্যোগে এই ক্যাম্পেইন শুরুতে ছিল একটি বিরল দৃষ্টান্ত। নারীর ইঞ্জিনিয়ার হবার কোনো অধিকার নেই, শুধুমাত্র এই ভ্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে মনট্রিলে ১৪ জন ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নে বিভোর অল্প বয়সী কানাডিয়ান মেয়েকে হত্যা করে একজন পুরুষ। নির্মম এই ঘটনাকে স্মরণ করে ৬ই ডিসেম্বর প্রতিবাদ হিসেবে পালন করা হয় ‘হোয়াইট রিবন’ নামে প্রতিবাদ ক্যাম্পেইন। ২০০০ সাল থেকে পক্ষকালব্যাপী নারী নির্যাতন প্রতিবাদ দিবস পালিত হচ্ছে। উপলব্ধির অগ্রগতি আজ সকলের বিবেকের তাড়না।

ঘুরে ফিরে সেই একই তর্ক। কেন শুধু নারী নির্যাতন? পুরুষ কি নির্যাতিত নয়?  অবশ্যই এই দেশ, এই সমাজ এবং বিশ্বে পুরুষও নির্যাতিত হন। সত্য, সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় একজন পুরুষকেও যুদ্ধ করে যেতে হয় আজীবন। একজন পিতার জন্য কন্যা সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে না পারার কষ্ট ছোট করে দেখবার কোনো উপায় নেই। কষ্ট, যুদ্ধ পরিবারে নারী-পুরুষ সবার। তবে নির্যাতন কেন হবে একার? আমরাই পারি প্রচারাভিযানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন, স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১৯০ জন। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন ২২ জন এবং খুন হয়েছেন ৪৯ জন।  পুরুষ নির্যাতনের এমন সহিংস রূপ ক’টি আছে?

বিবাহিত নারীদের উপর নির্যাতনের হার শতকরা ৮০ ভাগ। কিভাবে সম্ভব?  নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। শিক্ষিত নারীর হার বাড়ছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদন (২০১১) অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার ৭৮ শতাংশ এবং পুরুষের শিক্ষার হার ৭৫ শতাংশ। দেশের সার্বিক উন্নয়নে কৌশলগত কারণেই প্রাধান্য পাচ্ছে নারীর মানবাধিকার। পোশাক শিল্পে সিংহভাগ অবদানে অগ্রগণ্য নারী। শতকরা ৮০ ভাগ নারী ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা। নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় প্রতিকার হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন এবং স্বাবলম্বিতা। প্রতিবাদ হিসেবে আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে নারী।