প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, ধর্ষণ মামলায় আসামির খালাস পাওয়ার ঘটনায় আদালতকে দায়ী করার আগে গলদ কোথায় সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের দেশে ধর্ষণের শিকার অনেক নারী বা শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা হচ্ছে সর্বোচ্চ তিনদিন, চারদিন, সাতদিন বা পনের দিন পরে। এতে কোন আলামত থাকছে না, যথাযথ এভিডেন্স (সাক্ষ্য-প্রমাণ) কোর্টে যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় যদি খুব দ্রুত ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয় এবং শক্তিশালী একটি এভিডেন্স কোর্টে আসে সেক্ষেত্রে আসামির খালাস পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অতএব আদালতকে দায়ী করার আগে গলদটা কোথায় তা খুঁজে বের করতে হবে। এটা বের করা গেলে সমস্যার সমাধানও হবে।
শনিবার সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে ‘উচ্চ আদালতে সরকারি আইন সেবা: বিচার প্রার্থীগণের প্রত্যাশা ও জেল আপিল মামলা পরিচালনায় আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ও করনীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। সভায় সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম সভাপতিত্ব করেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ধর্ষণ মামলা ভিকটিমকে প্রমাণ করতে হয় এমন ধারণা ঠিক নয়। এই মামলা পরিচালনার দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের। আর এক্ষেত্রে প্রসিকিউশান হলো রাষ্ট্র। সুতরাং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সমস্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করা। এখানে যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সে একজন সাক্ষী মাত্র। সুতরাং ভিকটিমের সাক্ষ্য যদি খুব নির্ভরযোগ্য হয় তাহলে একজন আসামির সাজা হবে। আগে ছিল মামলার সকল এভিডেন্স অন্য সাক্ষী দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। কিন্তু সম্প্রতি আমরা একটা রায় দিয়ে বলেছি যে সাক্ষী যদি নির্ভরযোগ্য হয় তাহলে এভিডেন্স অন্য সাক্ষী দ্বারা সমর্থিত হওয়ার দরকার নেই। সুতরাং ধর্ষণের মামলায় মেডিকেল রিপোর্ট হচ্ছে ডাইরেক্ট এভিডেন্স। এই এভিডেন্সের মাধ্যমে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা অনেকটা সহজ।
নারী-নির্যাতনের মামলায় সাজার হার ৩ ভাগ-একজন বক্তার এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, আদালত বিচার করে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ যদি না পাওয়া যায় তাহলে আসামিকে সাজা দেয়া অনেকটাই কষ্টসাধ্য কাজ। এক্ষেত্রে শুধু হতাশ হলে চলবে না, হতাশার কারণও খুজে বের করতে হবে।
বিশেষ অতিথি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইমান আলী বলেন, আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান। সকল নাগরিক এবং তাদের সকলের জন্য আইন যদি সমান হয়, তাহলে গরিব-দু:খী মানুষের জন্য কেন আইনের বিধান ঠিকমতো প্রয়োগ করা হবে না? কেউ যদি দণ্ডপ্রাপ্ত হয় তাহলে সে সাজাভোগ করবে। কিন্তু একদিনও যেন বেশি সাজা না খাটে।
তিনি বলেন, আমরা আজ মহাকাশে যেতে পারছি, বাংলাদেশ এখন মহাকাশে আছে। ফলে আমরা সুবিচার নিশ্চিত করতেও পারব।
বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, সুপ্রিম কোর্টের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আইনে কি আছে সেটা বিচারপ্রার্থী জনগণ বুঝতে চায় না। হত দরিদ্রদের সরকারি আইনি সেবা নিশ্চিত করতে দায়িত্বরতদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট বার সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ন্যায় বিচার না হলে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হবে। এতে করে আমাদের সভ্যতা ধ্বংস হবে। যেসব বিচারক অযোগ্য তাদের অপসারণ করা উচিৎ।
অতিরিক্ত কারা মহা-পরিদর্শক কর্নেল ইকবাল হাসান বলেন, বর্তমানে কারাগারে ৭৯,৬৫৪ জন বন্দি রয়েছেন। এই বন্দির হার কমানো না গেলে কারাগারগুলোকে সংশোধনাগারে রূপান্তরিত করা যাবে না।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ধর্ষণ ও গণ-ধর্ষণের শিকারের পেছনের রয়েছে বিচারহীনতা। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার হচ্ছে তিন ভাগ। এদিকে নজর দেয়া দরকার। সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় বিভিন্ন জেলা জেলা ও দায়রা জজ, জেল সুপারগণ ও আইনজীবীরা বক্তব্য রাখেন।
ইত্তেফাক/ইউবি