বহুকালের প্রবাদ ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ বাঙালির জীবনের সঙ্গে সমান্তরাল। আসলে তেরো নয়, একটা সময় ছিল এই তেরো মানে অগণিত পার্বণকেই বুঝাত। কিন্তু যদি আমরা বাঙালির প্রধান তেরোটি পার্বণ অন্বেষণ করতে যাই এখন, তাহলে যে সব প্রধান উত্সব উঠে আসবে তা নিয়েই এবারের প্রচ্ছদ। নানা সূত্র থেকে সেসব পার্বণের বিবরণ সংকলিত করেছেন অথির চক্রবর্তী
পহেলা বৈশাখ
পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে বলা যায় প্রায় অনাদিকাল ধরে! বৈশাখ ঘিরে মেলা, শোভাযাত্রা, হালখাতা এমন কত কী! একই অঙ্গে যেন তার বহুরূপ। পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই যেখানে ঋতু চারটি, ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে আমাদের এখানে হয়ে গেল ছয়টি। যে জন্য এ দেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলেও অভিহিত করা হয়। এখানকার জল ও হাওয়া, মাটি, প্রকৃতি অন্য দেশ থেকে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেই সাধারণত এমনটি হয়ে থাকে। নাতিশীতোষ্ণময় এর আবহাওয়া। ফলে নিজেদের ঋতুবৈচিত্র্যকে মর্যাদা দিতে একটি সন খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর সে কারণেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। শ্রুতি আছে যে—তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময়ই অর্থাত্ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সালে তা কার্যকর হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনকে ভিত্তি করে এই বাংলা সনটি প্রবর্তিত হলো। নতুন এই সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামেই পরিচিত ছিল সর্বমহলে। পরে তা বঙ্গাব্দ বলেই লিখিতরূপ পায়। একটা সময় পহেলা বৈশাখ জমিদারদের পুণ্যাহের দিন বলেও পরিচিত ছিল। কৃষকরা ওই দিনটিতে যার যার খাজনা পরিশোধ করে ঋণমুক্ত হতো। এই ঋণ পরিশোধ পুণ্য অর্জনের মতো ছিল অনেকটা। তাই নাম হয়েছিল ‘পুণ্যাহ’। কিন্তু আকবরের আমলে এসে যখন অধুনা বাংলা সনটি প্রবর্তিত হলো—তা পরিণত হলো সর্বজনীন আনন্দের উত্সবে। বর্ষবরণের উত্সবে বদলে গিয়ে তা জমিদার ও প্রজার মধ্যে বছর বছর চলে আসা শ্রেণি-বৈষম্যেরও ইতি ঘটাল। কারণ এই পহেলা বৈশাখ জমিদার-প্রজা, ধনী-নির্ধন, হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার। এটা বাঙালিরই উত্সব। তার গল্পে, বর্ণমালায়, পুঁথিতে, লোকাচারে, গানে, কবিতায়, শোভাযাত্রায়, মেলায়, নৌকা বাইচে, মোরগ লড়াই বা ষাঁড়ের লড়াইয়ে সবকিছুতেই এই নববর্ষ আপন মহিমায় জায়গা করে নিয়েছে।
বৈসাবি
বৈসাবি মূলত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষবরণের উত্সব। এই উত্সবটি তিনটি ভাগ হয়ে আছে। ত্রিপুরা, মারমা, চাকমারাই এই বৈসাবিকে তাদের স্ব স্ব রীতি অনুযায়ী পালন করে থাকে। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে তাদের মধ্যেও উত্সাহ-আনন্দের শেষ নেই। ত্রিপুরাদের বর্ষবরণের উত্সবের নাম বৈসু। মারামাদের বর্ষবরণ সাংগ্রাই নামেই পরিচিত। আর চাকমাদের আছে এই উত্সবেরই আরেক নাম। তারা তাদের বর্ষবরণকে বিজু নামে অভিহিত করে। এই তিনে মিলে অর্থাত্ বৈসুর বৈ, সাংগ্রাইয়ের সা এবং বিজুর বি মিলেই বৈসাবি। তিনটি নৃ-গোষ্ঠীর মোহনা বা মিলিতরূপই যেন এই বৈসাবি। ত্রিপুরাদের এই বর্ষবরণ অতি মনোহর। তারা তিন দিন ধরে বৈসু পালন করে। এই তিন দিনের উত্সবের আছে তিন রকম নাম। উত্সবের প্রথম দিনটিকে ওরা বলে হারি বৈসু, দ্বিতীয় দিনটিকে বিসুমা বৈসু ও তৃতীয় অথবা শেষদিনটি বিসিকাতাল বা আতাদাং বসু বলেই পরিচিত। হারি বসুর দিন ত্রিপুরারা সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে। নিজেদের বসতভিটা লেপা-পোঁছা করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। তারপর একপ্রকার তেতোরস ও কাঁচা হলুদের রস মিশিয়ে স্নান করে। এটা তাদের কাছে পুণ্যস্নান। অনুষ্ঠানাদির মধ্যে আরো যেমন—বিভিন্ন রকম ফুল দিয়ে ওরা ঘরবাড়ি সাজায়। গবাদিপশুকেও স্নান করিয়ে ফুল দিয়ে সজ্জিত করে। ত্রিপুরা শিশুরা বাড়ি বাড়ি ফুল বিতরণ করে। তারপর দেবতার নামে নদীতে বা ঝরনায় ফুল ছিটিয়ে খুমকামিং পূজা করা হয়। কেউ কেউ পুষ্পপূজাও করে। ত্রিপুরাদের এই উত্সবটিতে ফুলের বিশেষ একটা স্থান আছে। ফুল ব্যতীত এই উত্সবটি চিন্তাও করা যায় না। উত্সবের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে থাকে আরো নানা আয়োজন। মহিলারা তৈরি করে বিন্নি চালের পিঠা ও চোলাই মদ। দাং, গুদু, চুর, সুকুই, উদেং, ওয়াকারাই নামের খেলাগুলোতে ত্রিপুরারা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে অংশগ্রহণ করে। কৃষক পাড়ায় হাঁস-মুরগির উদ্দেশে শস্যদানা ছিটিয়ে দেয়া হয়। উত্সবের দ্বিতীয় দিন বিসুমা বৈসুতে ধূপ-প্রদীপ জ্বেলে বর্ষকে স্বাগত জানানো ওদের রীতি। এই দিনটিতে সবাই নিরামিষ ভোজন করে। কোনো প্রাণী হত্যা করে না। আর শেষ অর্থাত্ বিসিকাতালের দিন ওরা বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করিয়ে পায়ে নৈবদ্য হিসেবে রাখে ফুল।
ঈদুল আজহা
এই দিনটিতে বিশেষ একটি মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে। আত্মত্যাগের গল্পই এই ঈদুল আজহার বড় অর্জন। এই আত্মত্যাগ মানুষের প্রতি মানুষের। কারণ আত্মত্যাগ ব্যতীত মানুষ কখনো সম্পূর্ণ হয় না। প্রস্ফুটিত হয় না তার হূদয়বাগানের ফুল। শাখা-পল্লবে যেমন গাছ দীর্ঘ ও প্রশস্ত হয়ে ওঠে, মানুষকেও তেমন দীর্ঘ হতে হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটি বড় উত্সবের একটি হলো এই ঈদুল আজহা। আজহা শব্দের ব্যুপত্তিগত অর্থ হলো উত্সর্গ করা। ঈদুল ও আজহা দুটোই আরবি শব্দ। কিন্তু এই শব্দ দুটি এখন বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। ত্যাগের সৌন্দর্যে, আচারে এটি এই ভৌগোলিক এলাকায়ও ব্যঞ্জনাময় ও অর্থবহ হয়ে উঠেছে। আচারের চিরাচরিত রূপ পাওয়া এই ঈদুল আজহার আয়োজনযজ্ঞে, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটা নিবিড় সংযোগ রয়েছে। ঈদুল আজহার শুরুটা হয়েছিল অনেকটা এভাবে—আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে মক্কার নিকটতম স্থান মিনাতে ৩৮০০ (সৌর) বছর পূর্বে কোরবানি দিতে উদ্যত হন। পরে আবার আল্লাহর নির্দেশেই প্রাণপ্রিয় পুত্রের বদলে পশু কোরবানি দেন। সেই থেকে দেশে দেশে এই ঈদ পালিত হয়ে আসছে। যেন এই ত্যাগের গল্পই বয়ে বেড়াচ্ছে বছরের পর বছর। নিজের মনের পশুত্বকে কোরবানি করাই হচ্ছে এর ভেতরের গল্প। নির্ধনদের মাঝে গোশত বিলিয়ে দেয়া কোরবানির পরবর্তী অনুষ্ঠিত কাজের একটি। এখানে আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেয়ার সূত্রটিও নিহিত। ঈদুল আজহা ১০ জিলহজ, যেদিন হাজিরা হজব্রত পালনকালে মিনাপ্রান্তরে পশু কোরবানি করেন এবং তত্পরবর্তী দুই দিন, বা তিন দিনব্যাপীও অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটিতে সবাই নতুন পোশাক পরিধান করে। পারস্পরিক কোলাকুলি, কুশল বিনিময় এইসব এই বঙ্গদেশে সম্প্রীতির দারুণ উদাহরণ।
শারদীয় দুর্গাপূজা
শারদীয় দুর্গাপূজা এখন সর্বজনীন উত্সবে পরিণত হয়েছে। অশুভকে প্রতিহত করে শুভকে প্রতিষ্ঠিত করাকেও এই দেবীপূজার অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শরত্কালে হয় বলেই এই পূজাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলে অভিহিত করা হয়। এই পূজা এখন বাঙালির সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। ঢাকের তালে তালে বেশ আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যদিয়েই এই পূজা সম্পন্ন হয়। দশভুজা দেবী একেক সময় একেক বাহনে করে আসেন। বলা হয়ে থাকে—দেবীর বাহনও আলাদা তাত্পর্য বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে পালিত হয়ে আসা এই পূজা নিয়ে আছে নানারকম গল্প। আছে দেবীকে নিয়েও নানা গল্প। জানা যায় দুর্গম অঞ্চলে মহিষাসুরকে বধ করার কারণেই এই দেবীর নাম হয়েছে দুর্গা। আর মহিষাসুর ব্রহ্মার বরে অবধ্য হয়ে ওঠে। সকল দেবতাদের ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কারণও হয়ে ওঠে সেইসঙ্গে। দেবতাদের অস্ত্রে সজ্জিত এই দেবী দ্বারাই শেষপর্যন্ত নিধন হয় এই মহিষাসুর। দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে জানা যায়—পুরাকালে রাজ্য হারিয়ে রাজা সুরথ একদিন মেধস মুনির আশ্রমে যান। মুনির পরামর্শ অনুযায়ীই তিনি দেবী দুর্গার পূজা করেন। পূজায় দেবী তুষ্ট হলে রাজা সুরথ আবার তার রাজ্যপাট ফিরে পান। বসন্তকালে হয়েছিল বলে—এর আরেক নাম বাসন্তী পূজা। কৃত্তিবাসের রামায়ণ বলে—রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য অকালে অর্থাত্ শরত্কালে দেবীর পূজা করেন। তখন থেকে এর নাম হয় অকালবোধন বা শারদীয় দুর্গাপূজা। বাসন্তী পূজার সময় হলো চৈত্রের শুক্লপক্ষে আর শারদীয় পূজার সময় সাধারণত আশ্বিন বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে। বঙ্গদেশে এই পূজার প্রচলন শুরু হয় সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। প্রচলন করেন রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ মতান্তরে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ( ১৭১০-১৭৮৩)। তবে জীমূতবানের দুর্গোত্সব নির্ণয় (আনু. ১০৫০-১১৫০), বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী (১৩৭৪-১৪৬০), শূলপাণির দুর্গোত্সব বিবেক (১৩৭৫-১৪৬০) কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণ (আনু. ১৩২১—১৪৬১) ইত্যাদি গ্রন্থে দুর্গাপূজার যে বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে অনুমিত হয় বাংলায় দুর্গাপূজা দশম বা একাদশ শতক থেকেই প্রচলিত।
বুদ্ধ পূর্ণিমা
গৌতম বুদ্ধের জীবনে বৈশাখ মাসটা খুব তাত্পর্যপূর্ণ। বৈশাখেরই তিনটি বিশেষ ঘটনার কারণে দিনটি ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ বা বৈশাখী পূর্ণিমা নামে আখ্যায়িত। গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে। এবং খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দের এই দিনেই বোধিপ্রাপ্তি তাঁকে আলাদা মাহাত্ম্য দেয়। তারপর ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বের এই দিনেই তাঁর মহাপরিনির্বাণ ঘটে। বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে বুদ্ধের ব্যাপারে যেটুকু জানা যায় সেটা হলো—আগের জন্মে বোধিসত্ত্ব সকল পারমি পূরণ করে স্বর্গে তিনি সন্তোষকুমার নামে পরিচিত ছিলেন। পরে দেবতাদের বিশেষ অনুরোধে জগতের মুক্তি ও দেবতা এবং মানুষের নির্বাণের জন্য তিনি মনুষ্যকুলে জন্মগ্রহণ করেন। ‘সবেব সত্তা ভবন্তু সুখীতত্তা’ অর্থাত্ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। এই ছিল গৌতম বুদ্ধের সমস্ত জীবনের সারাংশ। এই দিনটি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালন করে থাকে। এটি বৌদ্ধদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব হিসেবে আখ্যায়িত। তবে এই উত্সবটিও এখন সর্বজনীন। বাঙালি একে ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ হিসেবেই গ্রহণ করেছে। বছরের এই দিনটিতে আকাশে মস্ত এক চাঁদ উঠতে দেখা যায়। অপরূপ জ্যোত্স্নায় প্লাবিত হয় চরাচর। এ যেন বুদ্ধের আলোকিত আহ্বান। এই বুদ্ধ পূর্ণিমা ধনী-নির্ধন, ছোট-বড়, ধর্ম-বর্ণ নির্বেশেষে সবার। বৌদ্ধরা বুদ্ধপূজাসহ পঞ্চশীল, অষ্টশীল, সূত্রপাঠ, সূত্রশ্রবণ, সমবেত প্রার্থনার মতো বিবিধ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে দিনটিকে স্মরণ করে। বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ঘিরে বৌদ্ধবিহারগুলোতে চলে তিন দিনব্যাপী নানা কর্মযজ্ঞ। প্যাগোডাগুলো বাহারি ফুলে ফুলে সজ্জিত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা হতেই জ্বলে ওঠে অসংখ্য প্রদীপ। এই দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজন হিসেবে চট্টগ্রামের বৈদ্যাপাড়ায় বসে দেশের সবচেয়ে বড় মেলা। যা ‘বোধিদ্রুম’ মেলা নামে সমধিক পরিচিত।
নবান্ন
আহা হেমন্ত! জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন—ক্ষেত মাঠে
পড়ে আছে খড়
পাতা কুটো ভাঙা ডিম—সাপের খোলস নীড় শীত
এইসব উতরায়ে এখানে মাঠের ভিতরে
ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ—
কেমন নিবিড়।
একটা খাঁখাঁ আছে এই কবিতায়। কিন্তু ধানকাটার যে আনন্দ তা তো প্রাচীন। কৃষকেরা দলবেঁধে যখন ধান কাটে—তখন তারা গানও গেয়ে ওঠে। এই ধানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বপ্ন, ভালোবাসা কতকিছু! কৃষিভিত্তিক এই দেশে বা মাছে ভাতে বাঙালির এই দেশে—ধান অন্নপূর্ণা। এই ধানকে কেন্দ্র করে উত্সব পালিত হওয়াটা নিজেদের ঘরের অনুষ্ঠানের মতোই অনেকটা। শস্য, সন্তান, পশুসম্পদ এরকম অনেক কিছুকে কামনা করে এই উত্সব পালিত হয়। পাকা ধানের মৌ মৌ সুগন্ধে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। ঘরে ঘরে নতুন চালের পিঠা, আর দূর-দূরান্ত থেকে নাইয়র আসতে থাকা মেয়েদের জন্য এই নবান্নটা সুন্দর একটা উপলক্ষ বৈকি। উত্তর-পশ্চিম ভারতের উয়াজিরাবাদে নবান্ন উত্সব পালিত হয় বৈশাখে। রবিশস্য তোলার আনন্দেই মূলত এই নবান্ন উত্সব পালিত হয়। সাঁওতালরা শীতকালীন শস্য ঘরে তুলে পালন করে এই উত্সব। যেটা ‘সোহরায় উত্সব’ বলে পরিচিত। গারো নৃ-গোষ্ঠী ফল ও ফসল তোলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে দেবতার উদ্দেশে পূজা দেয়। নতুন ফসলের আনন্দে করে ওয়ানগালা। পানাহার, নৃত্যগীতে ওয়ানগালা পালিত হয়। আমন ধান কাটা শেষে অগ্রহায়ণ বা পৌষে গৃহস্থরা উত্সবে মেতে ওঠে। এই উত্সবের প্রধান অঙ্গ হিন্দুসংস্কৃতি অনুযায়ী নতুন চালে পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করা। দেবতা, অগ্নি, কাক ও আত্মীয়স্বজনদের নিবেদন করে তারপর গৃহকর্তা পরিবারবর্গ নিয়ে নতুন চালের অন্ন গ্রহণ করেন। উঠোনে উঠোনে দিনভর কি রাতভর চলতেই থাকে ধান মাড়াই। আর সেই ধান মাড়াই বা ধান তোলাকে আরো মহিমা দিতে এখনো কোথাও বসে পাড়ায় পাড়ায় পালাগানের আসর। মুখোশ পরে বাড়ি বাড়ি ছেলেরা এসে একসময় নৃত্যগীতও পরিবেশন করত। তবে আজ কালের বিবর্তনে অনেককিছু বিলুপ্ত হয়ে গেলেও হেমন্ত মানেই এখনো পাতাঝরার শব্দ, নতুন চালের পায়েস। নতুন চাল বেচে কৃষকের নতুন পোশাক কেনার মতো বিলাসিতাও।
বড়দিন
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উত্সব এই বড়দিন বা ক্রিস্টমাস। এইদিনে যিশু জন্মগ্রহণ করেন। খ্রিস্টীয় ২০০ সাল থেকে এই জন্মদিন পালিত হয়ে আসছে। ৩৫৪ সালটি যিশুর জন্মসাল হিসেবে ধরা হয়। বড়দিন এখন ধর্মনিরপেক্ষ উত্সব হিসেবেই পালিত। উপহার পাওয়া ও দেওয়ার চমত্কার একটি দিন বটে এটি। এই উপহার কে দিচ্ছে তার সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। বাচ্চারা মোজার ভেতর থেকে উপহার পেয়ে খুশিতে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইংল্যান্ডে আগের দিন রাতে বাচ্চারা যার যার দরজার বাইরে মোজা ঝুলিয়ে রাখে, পরদিন দেখা যায় মোজাগুলো উপহারে উপহারে ভরে গেছে। এমনকি ক্রিস্টমাস গাছের তলায়ও উপহার রেখে দেওয়া হয়। বড়দিনের আনন্দ যেন শিশুদের হাসির ভেতর দিয়ে নিহিত। উপহার বহনকারীদের একেক দেশে ভালোবেসে একেক নামে ডাকা হয়। ফাদার ক্রিস্টমাস, সান্তা ক্লজ, সেন্ট নিকোলাস। তবে আমাদের দেশে শিশুদের উপহারসামগ্রী নিয়ে আসে সান্তা ক্লজ। এই সান্তা ক্লজ শিশুদের অনেক পছন্দের একজন। সান্তা ক্লজের যে ছবিটি শিশুদের মনে চিরদিনের জন্য প্রতিভাত, তা হলো—তার পোশাক-পরিচ্ছদ বেশ অদ্ভুত। আর সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে আছে। যিশু যেমন শিশুদের অনেক পছন্দ করতেন, এই সান্তা ক্লজও শিশুদের ভালোবাসেন। আর উত্সবে আয়োজনের অংশ হিসেবে বাড়ি বাড়ি ক্রিস্টমাস ট্রিগুলো ছোট ছোট বাতিতে সজ্জিত হয়ে ওঠে। চার্চ বা গির্জায় প্রার্থনার জন্য সুন্দর পোশাক পরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা সমবেত হয়। চার্চগুলো নয়নাভিরাম আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে যিশুর জন্মদিনকে চমত্কার এক মাত্রা দেয়। এটা আনন্দের দিন, ভালোবাসার দিন।
বসন্তবরণ
বসন্ত যেন স্বর্গের একটি দ্বার উন্মুক্ত করতেই আসে। শীতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সে সদর্পে প্রকৃতির মঞ্চে এসে হাজির হয়। পহেলা ফাল্গুন বা বসন্তকে বরণ করে নেয়ার জন্য সবাই যার যার মতো তাকে স্বাগত জানায়। কেউ রবীন্দ্রনাথের গানের কথায় তাকে স্বাগত জানায়—‘আজ দখিন দুয়ার খোলা, এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত।’ সত্যি বাঙালির এই বসন্তবরণ অপরূপ হয়ে ওঠে সৌন্দর্যকে মনেপ্রাণে গ্রহণের বাসনা থেকেই। তারুণ্যের উচ্ছলতায় অবাধ আবেগের ঢেউ ছড়িয়ে সর্বত্র। এখানে ওখানে বেজে ওঠে কতরকম সংগীত। কতরকম আবৃত্তি। বাংলাদেশ যেমন নদীমাতৃক, ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ, তেমনি সে তো গানেরও দেশ। যে গানে আছে উজ্জ্বল উদ্ধার। ঢাকার চারুকলায় বকুলতলায় বসন্তবরণের এক অন্যরকম শোভা আছে। মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নেয়। আর ছেলেরা পরে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি। সারাদেশ সেই হলুদ ও বাসন্তী রঙে ছেয়ে যায়। এই ঋতুকে বরণ করে নেয়ার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অজস্র তরুণপ্রাণ। ঋতুবৈচিত্র্যে এই ঋতুর তুলনা নেই। সে শুধু ভালোবাসা জাগিয়ে যায়। ফুলের পরাগমাখা কোনো পতঙ্গের হঠাত্ উড়ে যাওয়ায়ও এই ঋতুর ভালোবাসার প্রকাশমহিমা আছে। ফুলে ফুলে প্রকৃতির গাছপালা অনবদ্য সাজে সেজে ওঠে। অশোক, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, কাঞ্চন, পারিজাত, মাধবী, গাঁদা। অজস্র ফুলে, রঙে, সৌরভে ভোলাতে এই ঋতু আসে। আর তার স্পর্শে সব সজীব হয়ে ওঠে। বসন্তকে বরণ করার মধ্যে দিয়ে বাঙালির সৌন্দর্যচেতনা অনেকটাই আঁচ করা যায়। আঁচ করা যায় বাঙালির ভালোবাসার উত্তাপও।
চৈত্রসংক্রান্তি
চৈত্রের শেষদিনে চৈত্রসংক্রান্তি পালিত হয়। এই চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে মেলা। নাড়ু, সন্দেশ, বাতাসা, দই ইত্যাদি বহু লোভনীয় খাদ্য নিয়ে জমে ওঠে মেলা। তার সঙ্গে পাওয়া যায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটির তৈরি বিভিন্নরকম খেলনা। এই মেলাতে আসে সবাই। চড়কগাছকে কেন্দ্র করে মেলা বসে মূলত। সন্ন্যাসীরা যেমন চড়ে এই চড়কগাছে, চড়ে সাধারণ লোকেরাও। একটি বিখ্যাত প্রবাদও আছে এই চড়কগাছকে নিয়ে। ‘চক্ষু চড়কগাছ’। হ্যাঁ চড়কগাছ মানুষের বানানো গাছ (উঁচু করে পোঁতা কাঠ)। এই গাছকে ধর্মীয় জ্ঞানে পূজা করা হয়। শূলফোঁড়া, বাণফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘুরতে দেখা যায় ভক্তদের। চড়ক গাজন উত্সবেরই আরেকটি অঙ্গ। এই উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে আরেক গ্রামের শিবতলায় গিয়ে শেষ হওয়ারও একটা ব্যাপার থাকে। মূলত দুজনই শোভাযাত্রাকে আলোকিত করে রাখে। শিব ও গৌরী (গৌরী অবশ্য পুরুষই কেউ সেজে থাকে)। আর শিব ও গৌরীকে ঘিরে নৃত্য করতে থাকে নান্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত ও দৈত্যদানব। শ্মশানচারী শিবের যত সহচর থাকে সব। শিব ও গৌরীর গল্পই অভিনয়ে মূর্ত করে তোলার প্রয়াস থাকে। গোটা চৈত্রমাস জুড়ে থাকে বিভিন্ন আচার, উপবাস, ভিক্ষান্নভোজন প্রভৃতি। বাংলাদেশে বহুকাল থেকে এই চৈত্রসংক্রান্তির মেলা হয়ে আসছে। থাকে মেলার পাশেই পুণ্যস্নান। এই মেলা উত্সবমুখর একটা সামাজিক মেলবন্ধন তৈরি করে আসছে বছরের পর বছর। গ্রামের মানুষের চিত্ত বিনোদনের মেলাও এটি। বায়োস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো এই সবকিছু মেলাতে থাকে। সবকিছু মিলিয়ে চৈত্রসংক্রান্তি এখন বাঙালির লোকউত্সবে পরিণত হয়েছে। এই দিনকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও কালীনাচও হয়। অসুরবধই এই নৃত্যের বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এই দিনে অতিথি সমাগমও ঘটে ঘরে ঘরে। এটা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে ছোটদের আশীর্বাদের একটা দিনও বটে।
ঈদুল ফিতর
এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটো বড় উত্সবের একটি। রমজানের এক মাস চলে সিয়াম সাধনা। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয় বাড়ি বাড়ি। সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার খাওয়ার যে আয়োজনটি, সেটা সত্যি অনেক আনন্দের। সবাইকে একই শামিয়ানার নিচে নিয়ে আসে। যারা রোজা রাখেন না, তাঁরাও এই আনন্দে সামিল হন। একইসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটি একান্নবর্তী পরিবারের কথা মনে করিয়ে দেয়। মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এলে রঙিন শরবতে রোজা ভাঙার এই রেওয়াজটি কঠিন নিয়মানুবর্তিতা বা কৃচ্ছ সাধনার কথা স্মরণে আনে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে—আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে। রোজার এই সান্ধ্য আয়োজনটি একটি চমত্কার একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দ নিয়েই যেন উপস্থিত হয় আমাদের সবার মাঝে। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর যখন আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা যায়, তখন সবার মুখে ফুটে ওঠে হাসি। হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে শাওয়াল মাসের এক তারিখ ঈদুল ফিতর পালিত হয়। ঈদের আগের দিনের রাতটি ধর্মীয় দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই রাতকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় লাইলাতুল কদর অর্থাত্ পুরস্কারের রজনী। আধুনিককালে অনেক দেশে গাণিতিক নিয়ম অনসারে ঈদ পালিত হলেও বাংলাদেশে এই ঈদ পালিত হয় শাওয়ালের চাঁদ দেখেই। কারণ আজ চাঁদ উঠলেই পরদিন ঈদ। এটা এদেশে প্রবাদসম। চাঁদ দেখার জন্য ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই অপেক্ষা করে। তবে কোথাও কোথাও সৌদি আরবের ঈদকে অনুসরণ করা হয়। সেই হিসেবে দেখা যায় দু দিন ঈদ পালিত হচ্ছে এদেশে। কিন্তু অধিকাংশই শাওয়ালের চাঁদের ওপরই নির্ভর করে। ঈদের এই আনন্দ নজরুলের ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহীয়ান’-এর সঙ্গে তুলনীয়। ঈদের আরেকটি সৌন্দর্য হলো এর কোলাকুলি পর্ব। সবাই সবাইকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কুশল বিনিময় করছে। করছে ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। সেমাই, মিষ্টি, পিঠা, সন্দেশের দাওয়াত থাকে বাড়ি বাড়ি সবার। সম্প্রীতির সুন্দর এক বীজ বোনা আছে ঈদের মর্মে। নতুন পোশাকে পোশাকে বাংলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত যেন রঙিন হয়ে ওঠে। প্রায় সবগুলো দৈনিক পত্রিকা ঈদের এই আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিতে বের করে ঈদসংখ্যা। চমত্কার লেখায় আর রঙিন অলঙ্করণে ঈদসংখ্যার পাতার পর পাতা হয়ে ওঠে বর্ণিল। পাঠকও এই ঈদসংখ্যার জন্য অপেক্ষা করে এই সময়টায়।
পৌষসংক্রান্তি
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পৌষসংক্রান্তি একটি বিশেষ দিন। এটি এখন একটি লোকউত্সবে পরিণত হয়েছে। বাংলা পৌষ মাসের শেষদিন এই দিবসটি পালন করা হয়। হরেক রকম পিঠার আস্বাদ দিতে এই দিনটি বাঙালির কাছে বছর ঘুরলেই আসে। নতুন চাল, খেজুরের গুড়, নারিকেল দিয়ে নকশাকাটা পিঠা, দুধপুলি, ক্ষীরপুলি, মালপোয়া, পাটিসাপটা, চিতই, ভাপাপিঠা—এরকম নানান মুখরোচক পিঠা তৈরির দিনই যেন এই পৌষসংক্রান্তি। ভারতের জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী সংক্রান্তি একটি সংস্কৃত শব্দ। এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। বারো রাশি অনুযায়ী মোট বারোটি সংক্রান্তি রয়েছে। মহাকাব্য মহাভারতেও এই দিনটির কথা উল্লেখ আছে। তাই এই দিনটির আলাদা একটি গুরুত্ব রয়েছে। পশ্চিম ভারতের গুজরাটে দিনটি বেশ ঘটা করে উদ্যাপিত হয়। কথিত আছে, মানুষ সূর্য দেবতার কাছে তার সুন্দর আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছেগুলোই রঙিন ঘুড়ি করে উড়িয়ে নিবেদন করে। ঘুড়ি মূলত এখানে প্রতীক বা রূপক হিসেবে ব্যবহূত। এই দিনটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুড়িউত্সব পালিত হয়ে থাকে। উত্সবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বেশেষে সবাই অংশগ্রহণ করে। এই ঘুড়ি উত্সবটি মোগল আমল থেকে এদেশে পালিত হয়ে আসছে। পুরান ঢাকায় এই দিনটিতে সারাদিনব্যাপী নানা কর্মসূচি থাকে। বিশেষ করে ঘুড়ি উত্সবকে কেন্দ্র করে। পুরান ঢাকায় পালিত পৌষসংক্রান্তিকে বলা হয় ‘সাকরাইন’। এই সংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামে-গঞ্জেও বসে চমত্কার সব মেলা। সেইসঙ্গে ঢোল, করতাল, একতারা, দোতারা সহযোগে বসে বাউল গানের আসর। এটি বাঙালির শেকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
দোলপূর্ণিমা
দোলপূর্ণিমা বা হোলি এখন সারাবিশ্বে উদ্যাপিত হয়। কোথাও কোথাও অবশ্য এই উত্সবটিকে হোরি বলেও অভিহিত করা হয়। মনের ইচ্ছের প্রকাশই যেন এই লাল, নীল, সবুজ, কমলা আরো যতসব রঙ! এই রঙে অপরকে রাঙিয়ে দেয়ার আনন্দই আলাদা। এই রঙের ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে মানুষের সুপ্ত প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, স্নেহ কত কী! রঙ যেন জীবনেরই প্রতীক। রঙের এই খেলায় মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। তাই আনন্দ প্রকাশে নেই তার কোনো বাধা। প্রজাপতির বিচিত্র রঙের পাখায় যত রঙ, তত রঙ তো মানুষের মনেও থাকে। বৈষ্ণবমতে এই রঙ খেলার ইতিহাসটা হলো—শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধিকা ও গোপীদের সঙ্গে রঙের খেলায় মেতেছিলেন এইদিন। আবির বা গুলালে একে অপরকে ওইদিন সবাই রাঙিয়ে দিয়েছিলেন। এই রঙ মাখানোটা এতদিনে ধর্মনিরপেক্ষ একটি উত্সব হয়ে উঠেছে এদেশে। ঈদ, দুর্গাপূজার মতো এটিও এখন সর্বজনীন একটি উত্সবের মর্যাদা পেয়েছে। রঙের ভাষায় মানুষ মানুষকে ভালোবাসছে। এরচে সম্প্রীতির বড় উদাহরণ আর হয় না। মুর্শিদাবাদসহ উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলায় দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে একজনকে সং বা ‘হোলির রাজা’ সাজিয়ে গ্রামে প্রদক্ষিণ করানো হতো। রাজা যাকে ছুঁয়ে দিত তার কাছ থেকে আনন্দব্যঞ্জক খাজনা আদায় করা হতো এবং পরে তা দিয়ে আনন্দ করার ঘটনা ঘটত। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে দিনটিকে উদ্যাপন করা হয়। রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই তা পালিত হয়ে আসছে। আর আমাদের এখানেও এর ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। রঙপর্বের পর হিন্দু-সংস্কৃতি অনুযায়ী এর রয়েছে আরো আচরিক কিছু দিক। যেমন—ওইদিন শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার বিগ্রহ আবির বা গুলালে রাঙিয়ে দোলায় চড়িয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয় এবং যাদের বাড়িতে বড় ‘দোল’ (মাটির বড় ঢিপি) আছে, তা ফুলে ফুলে ও আবিরের রঙে চমত্কারভাবে সজ্জিত হয়ে ওঠে। প্রচুর ভক্তের আগমন ঘটে এই উপলক্ষে। দোলকে ঘিরে বিভিন্ন ভক্তিমূলক গানও গাওয়া হয়। এ যেন শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে নিবেদিত।