বৈশাখী উত্সব এবং বাঙালির নববর্ষ

 ‘উত্সব’। শব্দটি ‘বঙ্গীয় শব্দকোষে’র বিবরণে ‘যাহা সুখ প্রসব করে’। ‘সুখ প্রসব করে’ও উত্সব যে, প্রসব থেকে নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। না, এটি শুধু সুখই প্রসব করে না; আনন্দ-প্রীতির ইচ্ছাও প্রসব করে। আর, এমন ইচ্ছাপ্রসূত সময়টিই, আজ বাঙালি আত্মপরিচয়ের দিনে রূপান্তরিত। এবং বাংলা মাসের প্রথম দিন হিসেবে বৈশাখ আলোকিত এবং আলোচিত। আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ জীবনের একান্ত নির্যাস রয়েছে এতে। রয়েছে অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবারই হূদয়কে কমবেশি এ উত্সব স্পর্শ করে। যে উত্সব নিয়ে এতকথা; কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে বলেছেন—‘তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম।’ তিনি তাঁর ‘উত্সব’ প্রবন্ধে বিস্তৃত করে বলেছেন ‘উত্সবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনে আমরা ফুল-পাতার দ্বারা সাজাই; দীপমালার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সঙ্গীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি।’ বলতে দ্বিধা নেই, এই ফুল-পাতায় সাজানো, দীপমালায় উজ্জ্বল করা, কিংবা সংগীতে মধুর করা; তা মূলত প্রকৃতিকেই স্মরণ করা। প্রকৃতিকেই বন্দনা করা। কারণ ফুল-পাতা প্রকৃতিপুঞ্জের আশীর্বাদ। দীপমালা সূর্য-চাঁদের প্রতীক। আর সংগীত মানুষের অন্তর্নিহিত আবেগের উত্সারণ। যে আবেগ উত্সারণে, বর্ষ শুরুর উত্সব; তা নিয়ত জীবনকে উজ্জীবিত করে। মানুষ যে যন্ত্রময় হয়ে ওঠে না, পশুস্তরে নেমে আসে না, জড়বত্ হয় না; জরাগ্রস্ততা থেকে মুক্তি পায়; তা এ পূর্ববর্ণিত উত্সবের জন্যই। উত্সবের আনন্দ দিয়েই, জীবনপ্রবাহের সূচনা করা ছিল আদিম সমাজেরও লক্ষ্য। আর তারই নিমিত্তে একদিন সকল জাতীর মধ্যেই উত্সবের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। উত্সবের সূচনা ছিল মানুষের আত্মিক সংস্কৃতির বাহ্যিক প্রকাশ।    

একসময়ে যা ছিল একান্ত ব্যক্তিক; তা আজ সর্বজনীন। মানব জীবনের সেই উষালগ্নে, সেই শিকারিজীবনে, শিকার পেয়ে তাকে পুড়িয়ে খাবার আগে, তাদের বাহ্যিক প্রকাশ, নৃত্যকলায় রূপান্তর করেছে; এবং তাদের মুখ নিসৃত আবেগমথিত স্বর, সুরের মধ্য দিয়ে সংগীতে অভিযাত্রা ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। শিকারের পূর্বে শিকারের ছবি আঁকা; তাও তো চিত্রকলারই বহিঃপ্রকাশ। অর্থাত্ চিত্রকলা, নৃত্যকলা, সংগীত সামষ্টিক জীবনে উত্সবের আমেজ এনেছে। যার বহুবিস্তৃত রূপ, আধুনিক বিশ্বের বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীতে সংক্রমিত হয়ে আছে।

এ এখন মাঙ্গলিক মিলনমেলার জন্ম দিয়েছে। সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ভাষায়, ‘এখানে অংশগ্রহণ করে সে প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট কিংবা গত্বাঁধা জীবনের ঊর্ধ্বে অন্যরকম আস্বাদনের আনন্দ উপভোগ করতে চায়। এই আনন্দ তাকে দেয় খানিকের স্বস্তি; এবং একইসঙ্গে তার চেতনায় সঞ্চারিত করে, শুভবোধ এবং মঙ্গলচিন্তা। উত্সবের মূল সুর নষ্টচিন্তার বাইরে, সত্য-সুন্দর এবং শুভবোধের মধ্যে আপন চেতনাকে প্রসারিত করা।’

চেতনার এই প্রসারণে, বাঙালি তার মতাদর্শগতভাবে বিভাজিত হয়েও, মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বিচ্ছিন্ন নয় তার প্রমাণ আমাদের বাংলা নববর্ষ উত্সব। এ উত্সব বাংলা নববর্ষের মিলনমেলাই আমাদের সমাজ জীবনকে নির্মল এবং ভেদবুদ্ধি মুক্ত করতে আজও রয়েছে। উদার নৈতিক মূল্যবোধ এবং উন্নতমানবিক জীবন, উপহার দিয়ে চলেছে। বিগত দিনের গ্লানি মুছে ফেলে নতুন সূর্যোদয়ে শুধু একটি দিন, ‘পালনের জন্য পালনে’ বাঙালি মেতে ওঠে না। নগর থেকে গ্রামে, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এ উত্সব। জাতীয় যে কোনো উত্সবের চেয়ে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। বেশি এজন্যই যে, এ চেতনা আমাদের বাঙালিয়ানায় মাতিয়ে তোলে। যে বাঙালিয়ানা বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছে এবং বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এ প্রেরণা রবীন্দ্র-নজরুলকে একসুরে বেঁধেছে। পাকিস্তানপর্বে এ উত্সবকে স্তিমিত করার যাবতীয় ফন্দি-ফিকির করেও পাকিস্তানি শাসকযন্ত্র যে সফল হয়নি; তার মূলে নিহিত এ চৈতন্য। এ চৈতন্য বাঙালির জীবনচৈতন্য। ভাষা এবং সংস্কৃতির চৈতন্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এবং ১৯৫৪ সালের হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের জয় এ চৈতন্যেরই ফসল। এ চৈতন্য সম্প্রদায়-সম্প্রীতির। ১৯৫৪ সালে সরলানন্দ সেনের ‘ঢাকার চিঠি’ বইয়ে লেখায় এ সম্প্রীতির উপলব্ধি নিয়ে এক বর্ণনায় শামসুজ্জামান খান লিখেছেন—

‘১১ এপ্রিল ডেট লাইনে পাঠানো ওই পত্রে বলা হয়, পয়লা বৈশাখ হিন্দু-মুসলমান প্রত্যেক বাঙালির প্রিয় নববর্ষ দিবস। যে দিন থেকে বাঙালি সংস্কৃতির সেবায় হিন্দু-মুসলমান দুই ভাই একে অপরের হাত ধরে আত্মনিয়োগ করেছে, সেদিন থেকে বাঙালির পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রিয় উত্সব দিবস।’ সেই উত্সব ১৯৫৮ সালের সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট হয়েও বেঁচে গিয়েছিল; এবং ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পালনের বাধা দেয়ায় উজ্জীবনী শাক্তি পায়। ১৯১৭ সালে আধুনিক নববর্ষ উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের ছায়ানটের আবির্ভাবকাল থেকে আজ অব্দি রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখে মানুষের মহামিলন ঘটে চলেছে। এখন সে মিলন এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করে, যা অন্যকোনো উত্সবে দেখা যায় না। ১৯৬৭ থেকে এ উত্সবের শুধুই এগিয়ে চলা; যা ২০০১ সালের বটমূলে বোমা নিক্ষেপ করেও, ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় নিরীহ মানুষ মেরেও, তা ক্ষান্ত করা যায়নি। পাকিস্তানি ভাবধারার অল্পশিক্ষিত কূপমণ্ডুকেরা জয়লাভ করতে পারেনি। পারেনি তার প্রমাণ ২০০২ সালের সম্মিলিত মানুষের মহাপ্লাবনের স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্য। আজ ‘ছায়ানট’ বর্ষবরণের সুবর্ণজয়ন্ত্রী অতিক্রম করেছে। এখন বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তা-ইলিশসহ নতুন পোশাকে বিচিত্রতর বহিঃপ্রকাশে ব্যস্ত । আজ এ উত্সব বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

পৃথিবীর দেশে দেশে বিভিন্ন ঋতুতে এ উত্সবের প্রচলন রয়েছে। বাংলায় বৈশাখ। এর কারণ হিসেবে শুধু যে খাজনা আদায়ের ব্যাপার ছিল; তা একমাত্র ব্যাপার নয়। এ প্রসঙ্গে মনীষী ড. এনামুল হক তাঁর ‘বাংলা নববর্ষ’ বা ‘পয়লা বৈশাখ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘কালবৈশাখীর তাণ্ডবলীলা ও তার পরে পরেই প্রকৃতির নতুন সৃষ্টির যে রূপটি বাংলাদেশে দেখা দিয়ে থাকে, তাই আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতিতে গ্রীষ্মকালের; এবং গ্রীষ্মকালীন উত্সব-অনুষ্ঠানের প্রাধান্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য করেছিল।’ এ উত্সবের এই প্রাকৃতিক প্রভাবেই সকল ধর্মমতের সমন্বিত প্রভাব লক্ষণীয়। বিশেষ কোনো ধর্মীয় প্রভাব এতে নেই। হালখাতা বা পুণ্যাহ একেক ধর্মমতে অনুষ্ঠিত হলেও, বাঙালিয়ানা তাতে ঘুচে যায় না। সকল মানুষের পানাহারে কোনো সম্প্রদায়কে আঘাত করে না। এমনকি কোনো পরস্পরবিরোধী খাদ্য-কালচারও এখানে জাঁকিয়ে বসতে পারেনি। পোশাকে-আশাকে চিরাচরিত বাঙালি রূপ এখানে দৃশ্যমান। সাহিত্য-সংগীতে-শিল্পে-নৃত্য-আমোদ-প্রমোদে বাঙালিয়ানারই চির জয়গান এখানে অবশিষ্ট। পত্রিকার পাতায় পাতায় বিশেষ যে সংখ্যা প্রকাশিত হয়; তাতে এ জয়গানের স্মারক বহন করে। আজও এসব আয়োজনের মধ্যদিয়ে প্রাচীনতম ঐতিহ্যেরই শেকড়সন্ধান চলে এবং চলেছে।

আধুনিক যুগে এসে বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রচণ্ড ধাক্কা লাগলেও; বাঙালি ঐতিহ্য পয়লা বৈশাখ তার স্বকীয় সত্তা হারায়নি। অসংখ্য নরনারী এ সত্তারক্ষায় আজও উত্ফুল্ল। নতুন স্রোত, নতুন সংস্কৃতি, নিত্য-নতুন আবিষ্কার, নতুন দর্শন চিন্তা; সমস্ত নতুন আবহমণ্ডলকে পয়লা বৈশাখ তার আপন ঐতিহ্য দিয়ে শুষে নিয়ে, একাকার করে নিয়েছে। কিন্তু নিজেকে বিলীন করে দেয়নি। বরং বলা যায়, সে নবসাজে সজ্জিত হয়ে, আধুনিক মানুষের মনন-সৃজনকে নবরূপে সাজিয়ে তুলছে। আসাম-ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল বাংলাভাষী ইরানের ‘নওরোজে’র মতো তাঁদের চিত্তে একে ধারণ করে। তাই তাঁর চিত্তানন্দ সগৌরবে সমুজ্জ্বল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উত্সব যে সুখ প্রসব করে, তা ক্ষেত্রবিশেষে বেদনাবিহীন। বেদনা যুক্ত হলে, উত্সব যে নতুন মাত্রা পায় তার প্রমাণ আমাদের ‘বিজয়োত্সব’ ও ‘স্বাধীনতাউত্সব’। সেখানে থাকে মুক্তির আনন্দ। সেই মুক্তির মিছিলে; তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অতীত ঐতিহ্যও পরিলক্ষিত হয়। তাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নতুন চেতনা পায়। সেই চেতনা পুষ্ট হয়ে স্লোগান ধরে—‘ধর্ম যার যার, উত্সব সবার।’