বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখন ৩৪ শতাংশ। এটিকে ৮২ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১.৮ শতাংশ। তবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে আনতে হলে তাদের জন্য কাজের পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
রাজধানীর কর্মজীবী নারীর তালিকা কত বড় তা জানা নেই। গত এক দশকে বাংলাদেশের নারীদের এগিয়ে চলার স্বীকৃতি মিলেছে বৈশ্বিক নানা সংস্থায়। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম এ বছর জুলাই মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে নারীদের অগ্রযাত্রায় রীতিমতো অভিভূত। তিনি বলেন- ‘কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ছে, এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আগামী এক দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ বাড়বে।’
অফিস-আদালতে যারা কাজ করে তাদের কিছু হিসাব প্রচারে আসলেও সমাজের এক শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের হিসাব কেউ জানে না, রাখেও না। আমাদের বাসা-বাড়িতে যারা বাঁধা বা ছুটা বুয়ার কাজ যারা করে, যারা সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাস্তার পাশে খাবারের হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, বাটি নিয়ে বসে থাকেন, তাদের তালিকা কয়জনে করে। আর তালিকা তৈরির দায়ভার ও কার কাঁধে পড়ে। জীবন আর জীবিকার তাগিদে তারা পরিবারের হাল ধরেন। কখনো একা, কখনো পরিবারের অন্যদের সাথে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে টিকিয়ে রেখেছেন পরিবারকে।
গিয়েছিলাম শাহবাগ পানলিক লাইব্রেরিতে, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়। হেঁটেই আসছিলাম বাসস্ট্যান্ড। জাতীয় জাদুঘর আর ফুলের দোকানের সামনে যে ফুটপাত রয়েছে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন পেশার কিছু নারীদের দেখি প্রায়। কেউ ফুল দিয়ে মালা গাঁথে, কেউ হাতে হাতে গাড়ির পাশে বিক্রি করতে যায়। কেউ আবার বড় ফুলের দোকানের আশপাশ থেকে ফুল কুড়িয়ে নিয়ে আসে। যখনি এপথে যাই, দাঁড়িয়ে ওদের কাজ দেখি, কারো কারো সাথে কথা হয়।
কয়েকদিন আগে ফুটপাতের দিকে চোখ পড়তেই ১০-১২ হাত দূরে কয়েকজন মহিলাকে বসে থাকতে দেখি। সবার সামনেই দু-তিনটা করে পাতিল, ৫ লিটারের একটা পানির বোতল, একটা প্লাস্টিকের গ্লাস আর দুটো করে প্লেট। খুব কৌতূহল হলো ওদের দেখে। পাশে বসার অনুমতি নিয়ে বসি, কিছু কথা বলা যাবে কি না জিজ্ঞেস করি। তারা কথা বলতে রাজি হন। আকলিমা বেগম, বয়স আনুমানিক ৫০-৫২। তার সামনে দুটো পাতিল রাখা। এখানে কী করেন, কোথায় থাকেন জানতে চাই। আকলিমা বলেন, ‘আমি ওই হাসপাতালের ডাক্তারদের বাসায় কাজ করি। বেশির ভাগ ডাক্তার এ হাসপাতালে ডাক্তারি করেন। হাঁড়ি-পাতিল ধোয়া, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে রান্নার কাজও করি। সকালের নাশতা আর রাতের খাবার প্রতিদিন রান্না করতে হয় না। দুপুরেরটা করি প্রতিদিন, দুপুরে ডাক্তার বাবুরা খাবার খাওয়ার পর যে ভাতগুলো বেঁচে যায় সেগুলো আমাকে দিয়ে দেন। ডাক্তার বাবুদের বেঁচে যাওয়া ভাত থাকলেও তরকারি থাকে না। যেটুকু ভাত বেঁচে যায় সে অনুপাতে বাজার থেকে মাছ কিনে রান্না করি। তারপর সে ভাত আর তরকারি নিয়ে সন্ধ্যার পর এখানে বসি, বিক্রি করি। প্রতি প্লেট ভাত আর মাছের তরকারি ৪০ টাকা। মাঝে মধ্যে সবজি বা ভাজি জাতীয় খাবার নিয়ে আসি, সব বিক্রি হলে বাসায় চলে যাই।’
নারীরা এখন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, সেটা ঘরে হোক, আর বাইরে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, একজন নারী পুরুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি কাজ করেন। এর মধ্যে রয়েছে সন্তান লালন-পালন, দৈনন্দিন বাজার, সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে সময় দেওয়া এবং গৃহস্থালির কাজ। এসব কাজের স্বীকৃতি অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে না। গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী তার ঘরে অবস্থান করে দৈনন্দিন যেসব কাজ করে, সেসব কাজের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৭৭ শতাংশের সমপরিমাণ। কিন্তু অর্থনীতিতে এ অর্থ যোগ হয় না। যদিও নারীরা তাদের গৃহস্থালির কাজ অর্থনীতিতে যোগ করতে কয়েক বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি বাড়ার পাশাপাশি অংশগ্রহণও বাড়ছে। নারীদের গড় আয়ুও পুরুষের তুলনায় বাড়ছে। বিবিএসের দেওয়া তথ্য মতে, কৃষি খাতে পাঁচ বছর আগে একজন নারীর দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ১৯৫ টাকা। সেটি এখন ২৭০ টাকা। পাঁচ বছর আগেও দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিল এক কোটি ৬০ লাখ। সেটি বেড়ে এখন এক কোটি ৮৩ লাখ।
ছবি: ইন্টারনেট