হার না মানা জাতি গঠনে সর্বাগ্রে যা করণীয়

 ‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে’— কবির এই উক্তি অন্যান্য দেশের জন্য কতটুকু প্রযোজ্য আমি জানি না, কিন্তু আমাদের দেশ যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাময় পরিবেশ, সেখানে তা একশভাগ প্রযোজ্য। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যাদের পর্যাপ্ত কাজ বা চাকরি আছে, কিন্তু চাকরি করার মতো লোক নেই। অন্য দেশ থেকে লোক এনে তাদের চাহিদা পূরণ করতে হয়। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমি ৬২টি পদের জন্য ৩৬০০ জনের লিখিত পরীক্ষা নিয়েছি। অর্থাত্ ৫৮ জনে ১ জন চাকরি পেয়েছেন। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র যখন এমন কঠিন, তখন সমগ্র জনগোষ্ঠীকে এর জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা অতীব জরুরি।

আমার পরিবারের খুব আপনজনের একটি ঘটনা দিয়ে মানসিক চাপ নিরসনে খেলাধুলা ও শরীরচর্চার বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার ছোট মেয়ের বয়স ১০। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। হঠাত্ দেখলাম স্কুলে যেতে চায় না। অল্পতেই কেঁদে ফেলে। পড়াশোনায় মন বসাতে পারে না। ওর মা পড়াশোনার জন্য চাপাচাপি করে। বই নিয়ে বসে থাকে কিন্তু পড়াশোনা করে না, মা বকাবকি করে। একদিন মেয়ের মা ফোনে দেখে আমার মেয়ে তার হতাশার কথা ব্যক্ত করে একটি ভিডিও করেছে। সে ভীষণ রকমের হতাশার একটি ভিডিও। দ্রুত একটি নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলাম। প্রফেসরের প্রেসক্রিপশন ছিল— সকালে ঘুম থেকে ওঠা এবং নিয়মিত বেশি বেশি খেলাধুলা ও হাঁটাহাঁটি করা। অর্থাত্ সুস্থ দেহ গঠনে কায়িক পরিশ্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিত্সা করতে গিয়ে জেনেছি, পিএসসি পরীক্ষার মানসিক চাপেই সে এমন অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে ভুগছিল। অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারের অনেকগুলো লক্ষণ আছে। এর মধ্যে একটি হলো, সামান্য চাপও এরা সামলাতে পারে না। সঠিক শারীরিক শ্রম, খেলাধুলার অভাবে যদি সমস্ত নবপ্রজন্ম অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে ভোগে তাহলে পার্থিব চ্যালেঞ্জ গ্রহণে পারদর্শী ভবিষ্যত্ প্রজন্ম তৈরি করা হবে সুদূরপরাহত।

আগের দিনে দেখতাম, শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামের মানুষ খেলাধুলাসহ অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রম বেশি করত। কিন্তু এখন গ্রামের চিত্র পাল্টেছে। গ্রামে বেড়াতে গিয়ে দেখি রাতের বেলা কিছু দূরের গাছের আড়ালে জোনাকির আলোর মতো আলো জ্বলছে। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দেখি— কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলে কাছাকাছি বসা। কারো কোনো দিকে খেয়াল নেই, মগ্ন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। গ্রামের মানুষও খেলা ছেড়ে ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করেছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার (ADHD) এর মতো রোগ। বাড়ছে হতাশা এবং তা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা।

গাজীপুরে বসবাস হওয়ায় ব্রয়লার মুরগির লালনপালন খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে ব্রয়লার মুরগির জীবনচক্র মোটামুটি ৪৫ দিনের। এই সময়ের মধ্যে এর ওজন হয় দুই থেকে আড়াই কেজি। দেখেছি, মুরগির শেডের বাইরে থেকে শিয়াল থাবা দিলেই ব্রয়লার মুরগি ভয় পেয়ে একদিক থেকে অন্যদিকে দৌড় দিতে গিয়েই হার্টফেল করে মারা যায়। আবার ঝড়বৃষ্টির দিনে বজ্রপাতের শব্দে অনেক সময় খামারের মুরগি হার্টফেল করে। এমনই নাজুক প্রাণশক্তি এদের। কিন্তু মানুষকে একটা দীর্ঘ সময় বাঁচতে হয় এবং সে সময় পৃথিবীর জন্য অনেক অবদান রাখার সুযোগ তার রয়েছে। প্রতিক্ষেত্রে সমাজে সহ্য করতে হয় বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও শারীরিক চাপ। এতে যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। কারণ মানুষের সমষ্টিগত মেধা ও শক্তি দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চালিকা শক্তি। শঙ্কিত হই যখন শুনি—মোটরসাইকেল স্টার্ট করতে গিয়ে পরিচিত ব্যক্তি হার্টফেল করেছেন।

বর্তমান যুগে আমাদের শারীরিক পরিশ্রম নেই বললেই চলে। ছোট থেকে বড় সবাই কোনো না কোনোভাবে স্মার্টফোনে সময় কাটাচ্ছে। বিকাল হলেও তারা খেলতে না গিয়ে স্মার্ট ফোনে বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বা গেম খেলছে। ছেলেমেয়েকে ঠেলেও খেলার জন্য বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না। এতে নতুন প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, উত্কণ্ঠা, বিষণ্নতা সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় হরমোন দ্বারা। শরীরে হরমোনের অনুপাত সঠিক মাত্রায় থাকলে মানুষ সুস্থ, সাবলীল, কর্মোদ্যমী ও হাসিখুশি থাকে। হরমোনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখার জন্যও দরকার প্রতিদিন নিয়মিত মাত্রায় কায়িক পরিশ্রম, খেলাধুলা ও সঠিক মাত্রায় ঘুম। কিন্তু বর্তমান সময়ে জীবন যাপনের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে আমরা এগুলো থেকে যোজন দূরে।

উন্নত বিশ্বে শারীরিক ও মানসিক চাপ সহনের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম, খেলাধুলার ব্যবস্থা। এছাড়া এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পায়ে হেঁটে পথ অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট সুব্যবস্থা আছে। সেখানে নেই আমাদের দেশের মতো একশ গজ পর পর অটোতে চড়ার সুযোগ। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে খেলাধুলা করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং এর নিয়মিত চর্চা। পার্কগুলোতে এবং রাস্তার আলাদা লেনে রয়েছে সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা। আমাদের দেশে অধিক জনসংখ্যার কারণে ফাঁকা মাঠ নেই বললেই চলে। যা আছে তা অপ্রতুল। তাই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খেলাধুলাকে শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করলে অবশ্যই এর সুফল আমরা দেখতে পাব।

 নেতিবাচক জীবনাচার এবং কায়িক পরিশ্রমকে অবজ্ঞা করার কারণে আমাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উন্নত দেশ গঠনের প্রধান নিয়ামক হলো মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত সুস্থ জনগোষ্ঠী। তাই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা রক্ষাকল্পে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে গ্রহণ করতে হবে বিভিন্ন পদক্ষেপ। বাড়াতে হবে জনসচেতনতা। সংখ্যার বিচারে নয়, সুস্থতার বিচারে হিসাব করতে হবে জনশক্তি ও সামর্থ্য। তবেই আমরা বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে পারব আমাদের বিজয় নিশান।

n লেখক : অধ্যাপক, ডুয়েট, গাজীপুর