রাজা যায়, রাজা আসে। রাজধর্ম বজায় থাকে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতে সব চেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্সব লোকসভা নির্বাচন। সুবিশাল এই দেশে ভোটার ৯০ কোটি। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের জনসংখ্যাই এর চেয়ে ঢের কম। বিরাটসংখ্যক ভোটার, প্রার্থী এবং ৫৪৩টি আসনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া সামলে নির্বিঘ্নে ভোট সম্পন্ন করা আসলে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জের কাজটা নিরপেক্ষভাবে করে চলেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন ঘোষণা হয়েছে ১০ মার্চ। ভোটগণনা ২৩ মে। জয়ী প্রার্থীদের প্রশংসাপত্র প্রদান করে ভোটপ্রক্রিয়া সমাপ্ত হবে ২৬ মে। ৭৭ দিন ধরে ভারতে জারি থাকবে ‘মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট’ বা আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি। সেই বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা বা সরকারি প্রকল্প উদ্বোধন করা যাবে না। এই আচরণবিধি যথাযথভাবে দেখভাল করে নির্বাচন কমিশন। প্রধানমন্ত্রীর পদে নরেন্দ্র মোদি। তবে তাঁর বা মন্ত্রিসভার এই সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো ক্ষমতা নেই। পরবর্তী সরকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাবেন মাত্র। পুলিশ, প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হবে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। সংবিধান, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে শাসকদলের জন্যও কঠিন তারা।
সাত দফা ঘোষণা
শুরুটা হয়েছিল সব রাজ্যে নির্বিঘ্নে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনায় ৭ দফা ভোট ঘোষণার মাধ্যমে। তারপর নির্বাচন পরিচালনায় ভোটারদের মনে ‘সাহস’ বাড়াতে রাজ্যে রাজ্যে আধাসেনা নামানো। তাতে বহু ক্ষেত্রেই শাসকদল ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারপরও নির্বাচন কমিশন তার প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছে। ভারতে ভোট প্রক্রিয়ার একটা বড় অংশই রয়েছে শাসকদল যাতে কোনো মতে বাড়তি সুবিধা না পেতে পারে। এর জন্য ভোট ঘোষণার আগে ৩ বছর একই পদে রয়েছেন এমন পুলিশ কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসককে বদলি করে দেওয়া হয়। তারপরও শাসক দল সুবিধা পেতে পারে এমনটা মনে হওয়ায় ভোট ঘোষণার পরও পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। অন্যত্রও এমনটা ঘটেছে।
তবে নির্বাচন কমিশন সব থেকে বড় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বায়োপিক ‘পিএম নরেন্দ্র মোদির মুক্তি আটকে দিয়ে। ভোট ঘোষণার পর এই সিনেমাটি মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রযোজক। বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিমকোর্ট বল ঠেলে দেয় ভারতের নির্বাচন কমিশনের কোর্টে। বলে তারাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। ১১ এপ্রিল সিনেমাটি মুক্তির দিন ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তার কয়েক ঘণ্টা আগে ১০ এপ্রিল মোদির জীবনীচিত্র দেখানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাচন কমিশন। জানিয়ে দেয়, ভোটপর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটা কোনোমতে দেখানো যাবে না। দেশ জুড়ে বাহবা জোটে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুনীল আরোরার।
তবে এ বিষয়ে তাঁর পথিকৃত বোধ হয় টি এন শেষণ। ১৯৯০ থেকে ৯৬্ত টানা ৬ বছর ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন তিনি। নিরপেক্ষতার অন্য এক মাত্রা তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। ভারতে সচিত্র পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভোটের তিনিই প্রবর্তক। এর জন্য প্রয়াত কমিউনিষ্ট নেতা তথা পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তাঁকে ‘মেগালোম্যানিয়াক’ তকমা দিয়েছিলেন। তাতে তাঁর কিছু এসে যায়নি। কারণ সচিত্র পরিচয়পত্রের মাধ্যমে তিনি ‘ভূতুড়ে’ ভোটার এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তেমনই পেরেছিলেন একটা নির্বাচনে প্রার্থী কত টাকা খরচ করতে পারবেন তার সীমা নির্ধারণ করে দিতেও। কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সুনীল আরোরার মনোভাব ফিরিয়ে আনছে সেই টি এন শেষণের স্মৃতি। ভারতের নির্বাচন কমিশনার হন কোনো সাবেক আইএএস (ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস) অফিসার। যাতে তাঁর ওপর কোনো রকম সরকারি প্রভাব না থাকে।
কঠোর সুনীল আরোরা
নিয়মভঙের ক্ষেত্রে পূর্বসূরি শেষণের মতই কড়া সুনীল আরোরা। নির্বাচনী প্রচারে ধর্ম, জাতপাতের বিষয় তোলা যাবে না, বলা হয়েছিল ভারতের নির্বাচন কমিশনের তরফে। সেই নিষেধাজ্ঞা না মেনে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির যোগি আদিত্যনাথ বলেছিলেন, ‘এসপি বিএসপি কংগ্রেস যদি আলিতে বিশ্বাস করে তাহলে আমরা বিশ্বাস রাখি বজরঙ্গবলিতে’। এর কারণে তাঁর প্রচারে ৩ দিন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। উত্তর প্রদেশেরই বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী মুসলিম ভোট ভাগাভাগি রুখতে বার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর প্রচারে ২ দিন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। একইভাবে নির্বাচনী প্রচারে ধর্ম ব্যবহার করায় বিজেপির মন্ত্রী মানেকা গান্ধীরও প্রচারে ২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
নির্বাচনে টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে এই কারণে ভোট বাতিল করা হয়েছে তামিলনাডুর ভেলোর কেন্দ্রে। ভোটের আগে সেখানে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার হয় আঞ্চলিক দল ডিএমকের এক নেতার গুদাম থেকে। ভেলোরে সেখানে ১৮ এপ্রিল ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা ছিল। সেখানে কবে ভোটগ্রহণ হবে তার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। একই ভাবে আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কারণে ভোটগ্রহণ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে পূর্ব ত্রিপুরা লোকসভা কেন্দ্রে। এখানেও ১৮ এপ্রিল ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা ছিল। পূর্ব ত্রিপুরায় ভোটগ্রহণ হবে ২৩ এপ্রিল। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশ কর্মকর্তা রাজীব সিংকেও।
ভোট প্রক্রিয়া শুরুর সময় থেকেই ইভিএমের (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ভারতের বিরোধী দলগুলো। শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ ছিল, ইভিএমে কারচুপির ব্যবস্থা করা হতে পারে। দাবি তুলেছিল অন্তত ৫০ শতাংশ আসনে ভিভিপ্যাট (ভোটার ভেরিফায়েড পেপার অডিট ট্রেল) ব্যবহারের। ভিভিপ্যাট একটি বিশেষ ব্যবস্থা। এই প্রক্রিয়ায় ইভিএমের সঙ্গে একটি যন্ত্র যুক্ত থাকে। তাতে কাগজ থাকে। কোনো ভোটার সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পর ওই যন্ত্র থেকে একটি কাগজ বেরিয়ে আসে। সেখানে ভোটার কাকে ভোট দিয়েছেন তা দেখে নেওয়া যায়। কিছুক্ষণ পর কাগজটি ভিভিপ্যাটে ঢুকে যাবে। সন্দেহের উদয় হলে ওই স্লিপ বের করে হবে গণনা। বিরোধীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবার অনেক বুথে ভিভিপ্যাট ব্যবহার করছে। অদূর ভবিষ্যতে ভারতে পুরো নির্বাচনই হতে পারে ভিভিপ্যাট স্লিপ গণনার মাধ্যমে।