সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালনা বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রাক্কালে

এক  বছর আগে, সৌদি আরবে কোন নারী চিকন ‘জিনস’ আর  টি-শার্ট পরে হার্লে-ড্যাভিডসনের কোন মোটরসাইকেল চালাচ্ছে, এ বিষয়টি অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু আর কয়দিন পরেই দেশটিতে নারীদের ওপর থেকে গাড়ি চালনা বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার কথা রয়েছে। সেই প্রত্যাহারের হাওয়া এখনই লেগেছে সংরক্ষণশীল দেশটিতে।
 
মোটরসাইকেল চালানো শিখছেন সৌদি নারীরা। আগামী ২৪ তারিখ থেকে স্বাধীনভাবে গাড়ি চালানোর অধিকার পাবে তারা। সে স্বাধীনতা উপভোগ করতে বেসরকারি গাড়ি চালনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘বাইকারস স্কিলস ইনস্টিটিউটে’ আনাগোনা বেড়েছে নারীদের। এর মধ্যে একজন হচ্ছেন ৩১ বছর বয়সী নৌরা।
 
আসল নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে নৌরা বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমার মোটরসাইকেল চালানোর শখ ছিল। আমি আমার পরিবারের সদস্যদের মোটরসাইকেল চালাতে দেখে বড় হয়েছি।  এখন, আমি আশা করি, রাস্তায় নিজে মোটরসাইকেল চালানোর দক্ষতা অর্জন করতে পারবো আমি।
 
IMG0
 
প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরবে নানা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। নারীদের ওপর থেকে গাড়ি চালানো বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেয়ার পেছনেও তার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকজন নারী মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতারে এই সংস্কার অভিযানের উল্লাসে ভাটা পড়েছে। গ্রেফতারকৃত নারী মানবাধিকার-কর্মীরা বহুদিন ধরে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলো।
 
নৌরার পাশেই সুজুকি কোম্পানির একটি মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন গরম করছে সৌদি-বংশোদ্ভূত জর্ডানিয়ান লিন তিনাওয়ি(১৯)।  উভয়ের জন্যই মোটরসাইকেল চালানোটা বহুদিনের জমিয়ে রাখা শখ। পাশাপাশি এটা একধরণের ক্ষমতায়নও।
 
তিনাওয়ি বলেন, আমি আমার মোটরসাইকেলে চড়ার পুরো অভিজ্ঞতাকে এক শব্দে বর্ণনা করতে পারি- স্বাধীনতা। 
 
আগে বেশিরভাগ দিন তাদের প্রশিক্ষণের জায়গাটি পুরুষ দিয়ে ভর্তি থাকতো। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে মেয়েদের জন্যেও একটি  কোর্স চালু করার পর চারজন উৎসাহী নারী প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি হন বলে জানান, তাদের শিক্ষক বুকারিয়েভা।
 
IMG1
 
বুকারিয়েভা বলেন, তারা সবসময়ই মোটরসাইকেল চালানো শিখতে চাইতো। আর এখন তারা বলে, ‘এটা আমার সময়’।
 
মোটরসাইকেল চালানো শিখতে বেশি সংখ্যক নারী কেন ভর্তি হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে বুকারিয়েভা বলেন, হয়তো তাদের পরিবার তদের বাঁধা দেয়। তার এই মন্তব্য সমর্থন করে তিনাওয়ি। তিনি জানান, তার পরিবার থেকেও তাকে তীব্র বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
 
তিনাওয়ি বলেন, আমার বাবা-মা বলতো: তুমি মোটরসাইকেল চালাবে? তুমি একটা মেয়ে। এটা বিপজ্জনক।
 
সৌদি আরবে গাড়ি চালানোটা বহুদিন ধরে কেবল পুরুষদেরই অধিকার ছিল। এমনকি নারীদের ওপর থেকে গাড়ি চালানো বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়া পর্যন্ত সৌদি আরব হচ্ছে একমাত্র দেশ যেখানে নারীদের গাড়ি চালাতে দেয়া হয় না।
 
অনেক নারী আশঙ্কা করছেন যে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেও তাদের পুরুষ অভিভাবকরা তাদের গাড়ি চালাতে দেবেনা। এসব অভিভাবকদের মধ্যে রয়েছে, তাদের বাবা, স্বামী, ভাই বা অন্যান্য আত্মীয়। তারা তাদের স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব খাটিয়ে নারীদের দমিয়ে রাখতে পারে।
 
IMG2
 
নারীদের জন্য মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিন্তার বিষয়টি হচ্ছে ‘পোশাক’। প্রশিক্ষণশালায় তারা চিকন জিনস আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় পোশাক পড়ে মোটরসাইকেল চালাতে পারে। কিন্তু জনসম্মুখে তেমনটা অচিন্তনীয়। সৌদি আরবে নারীদের জন্য পুরো শরীর ঢাকা থাকে এমন বোরখা পরা আবশ্যক। আর বোরখা পরে মোটরসাইকেল চালানোটা বাস্তববোধশূন্য।
 
এছাড়া, দেশটিতে নারী শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে। তার ওপর প্রশিক্ষণের খরচও অনেক। কিন্তু এসবের চেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে নারী মানবাধিকার কর্মীদের ওপর সরকারে নির্যাতন।
 
একদিকে সরকার নারীদের ক্ষমতায়ন করছে। অন্যদিকে সে ক্ষমতার ব্যবহারের আগেই আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, এই মাসে ১৭ নারী মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেননা, তারা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ছোট করে দেখেছিল। তাদেরকে গাড়ি চালানোর জন্য বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বর্ণনা করা হয় রাষ্ট্র পরিচালিত গণমাধ্যমে।
 
পুরো বিশ্বজুড়ে নারী মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতার সমালোচিত হয়েছে। এমনকি ক্রাউন প্রিন্সের সংস্কার অভিযানের অনেক সমর্থকও সরকারের এই পদক্ষেপকে ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
 
পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, এই গ্রেফতারগুলো হিসেব করে করা হয়েছে। ক্রাউন প্রিন্স নিশ্চিত করতে চান যে এই সংস্কার অভিযান কেবল তিনি একাই চালাবেন, কোন অধিকারকর্মীরা নয়।
 
নৌরা আর তিনাওয়ির প্রশিক্ষনস্থলেও ওই নারীদের গ্রেফতারের বিষয়ে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি হয়নি কেউ। পুরো সৌদি আরবজুড়ে এখন এক ধরণের স্বচ্ছ ভয়ের বিচরণ চলছে।(এএফপি অবলম্বনে)। 
 
ইত্তেফাক/ জেআর