সাফল্য নিয়ে সংশয় বিশ্লেষকদের

শীতকালীন অলিম্পিক দিয়ে শুরু হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে আসর বসেছিল দক্ষিণ কোরিয়ায়। আর তার মাস খানেক আগেই যৌথ বৈঠকে ঠিক হয়ে যায় সেখানে দল পাঠাতে তৈরি উত্তর কোরিয়া। একটু একটু করে বরফ গলতে শুরু করে দুই কোরিয়ার। মঙ্গলবার সকালে সেই বরফ আরো বেশি করে গলার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। কোরীয় যুদ্ধের পর এক টেবিলে বসলেন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার সরকার প্রধান। বিশ্বকাপের আর মাত্র ৩ দিন বাকি ছিল গতকাল। মস্কোয় জোর অনুশীলন চলছে রোনাল্ডো আর মেসিদের। তবু রাশিয়া তথা বিশ্বের চোখ ছিল সিঙ্গাপুরের দিকে। গতকাল ‘মোটা খ্যাপাটে বুড়ো’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা ‘বেঁটে রকেট ম্যান’ কিম জং উন এক যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করেন।

 

কিমকে ছাড় ট্রাম্পের?

 

দুই নেতার স্বাক্ষরিত দলিলে কিম কোরিয়া উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে এরপর এক নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এমন কিছু খুঁটিনাটি প্রকাশ করেন যার উল্লেখ কাগজপত্রে নেই। একান্ত বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা একটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র ইঞ্জিন পরীক্ষা ক্ষেত্র ধ্বংস করতে রাজি হয়েছেন। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে লক্ষ্য করে সামরিক মহড়া চালানো বন্ধ করবে। তিনি এসব যুদ্ধের মহড়াকে ‘ব্যয়বহুল এবং উস্কানিমূলক’ বলেও বর্ণনা করেন। কেউ কেউ অবশ্য এই মহড়া বন্ধের অঙ্গীকারকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দিয়েছে বলে চিত্রিত করতে চাইছেন।

 

সমস্যার সমাধান হলো?

 

কূটনৈতিক মহল বলছেন, কিম কিংবা ট্রাম্প তাদের দু’জনকেই বোঝা দায়! বৈঠক পরবর্তী সময়ে দু’জনই শান্তির পথে থাকবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। কিম পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে কতটা গুরুত্ব দেবেন? শেষ পর্যন্ত দেশে মজুদ থাকা পরমাণু ধ্বংস করবেন কিম? আবার উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে যে প্রায় সাড়ে ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা মজুদ রয়েছে তা সরিয়ে নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প? এই বৈঠক কী দুই কোরিয়ার দ্বন্দ্ব মেটাবে? এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মাথায়। সিএনএনের সাংবাদিক কেভিন লিপট্যাক বলেছেন, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে বিশেষ বন্ধন তৈরি হলেও পরমাণু অস্ত্রমুক্ত কোরীয় উপদ্বীপ নিয়ে করা অঙ্গীকার ততোটা শক্তিশালী নয়। আর কিভাবে এটা করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি বলে কোন কোন বিশ্লেষক মতামত দিয়েছেন। তারা বলছেন, মাত্র দেড় পৃষ্ঠার এই দলিলটি অস্পষ্ট এবং এর ভেতরে কিছু নেই।

 

ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস এর সিনিয়র ফেলো অ্যান্থনি রুগিয়িরো বলেন, এই সমঝোতায় কোরীয় উপদ্বীপ পরমাণু অস্ত্রমুক্ত হবে কিনা তা অস্পষ্ট। অতীতে যেমন অঙ্গীকার চ্যুত হয়েছে এবারও তাই হবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। তিনি জানান, দশ বছর আগে এরকমই একটি সমঝোতা হয়েছিল যা বাস্তবায়িত হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের সাবেক এশিয়া বিষয়ক কূটনীতিক ড্যানিয়েল রাসেল বলেন, ঘোষণায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপনাস্ত্রের বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

 

বৈঠকের সমালোচনা

 

ঐতিহাসিক এই বৈঠক নিয়ে অধিকাংশ মানুষ আগ্রহী হলেও সামলোচনাও করছেন অনেকে। লেখক ভিক্টোরিয়া ব্রাউনওয়ার্থ তার টুইটারে লিখেছেন, যে ট্রাম্প অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের সাথে করমর্দন করেননি ও জাস্টিন ট্রুডোকে দুর্বল বলেছেন, সেই ট্রাম্প নিজ পরিবারের মানুষ হত্যা করে এমন একজন একনায়কের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কূটনীতিকদের একাংশ বলছেন, ট্রাম্পের এক কথায় হেলায় সব অস্ত্র ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নন কিম। পিয়ংইয়ংয়ে যেমন ‘আমেরিকা বিরোধী’ জাদুঘর আছে, কোরীয় উপদ্বীপে তেমনই ঘাঁটি গেড়ে রেখেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। বৈঠক ইতিবাচক হলেও সেনা সরিয়ে নেওয়া নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি ওয়াশিংটন। বৈঠকের পুরো ব্যাপারটাই তাই ট্রাম্পের ‘লোকদেখানো’ বলে মনে করছেন অনেকে। সিঙ্গাপুরেরই এক কূটনীতিকের কথায়,  ট্রাম্প বরাবরই প্রচার ভালবাসেন। এবারও তার লক্ষ্য বিশ্বের সেরা ‘ডিল মেকার’ হিসেবে একটা ভাবমূর্তি গড়ে তোলা। -বিবিসি ও সিএনএন