তথ্যটা শোনার পর যে কারোরই চমকে যাওয়াটা স্বাভাবিক। ১৯৭০ থেকে ২০০৯, এ সময়ে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে ১.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর এ অঙ্কটা একই সময়ে ওই মহাদেশে আসা বিদেশি সাহায্যের চেয়ে বেশি এবং বিদেশি ঋণের পাঁচগুণ। ২০১০ থেকে ২০১৮, এ সময়ে ওই মহাদেশ থেকে অবৈধভাবে বাইরে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার!
আন্তর্জাতিক মন্দা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকা থেকে অর্থ পাচার কমেনি। এ অবস্থায় ইথিওপিয়ার শহর বাহার দারে গত সপ্তায় সম্মেলনে বসেছিল আফ্রিকার নেতারা। এর আয়োজক ছিল আফ্রিকার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট টানা হাই লেভেল ফোরাম নামক একটি বেসরকারি সংগঠন। উদ্দেশ্য— সম্মিলিত উদ্যোগে দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্থ পাচার প্রতিরোধ করা। ১৯৭০ সাল থেকে এ মহাদেশে গড়ে প্রতি বছর অর্থ পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে ১২.১ শতাংশ হারে। এ দুষ্কর্মটি সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোয় সবচেয়ে বেশি ঘটছে ঠিকই, কিন্তু মহাদেশের অন্য কোনো দেশও মুক্ত নয়, এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকাও।
বলার অপেক্ষা রাখে না, পাচার হওয়া অর্থের সিংহ ভাগই অর্জিত হয় অবৈধভাবে এবং স্থানান্তরিত হয় মূলত অন্যত্র ব্যবহারের জন্য। সাধারণত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই এসব অর্থের উত্স হয়ে থাকে। এ তালিকায় আছে ঘুষ, দুর্নীতি, কর ফাঁকি ও চোরাচালান। জবাবদিহি করার ভয়ে অপরাধীরা যতটা দ্রুত সম্ভব অর্থ পাঠিয়ে দেয় ভিনদেশে। সচরাচর যা ঘটে তা হচ্ছে, প্রথমত ঠিকানা হয় আফ্রিকার অন্য কোনো দেশ। সেখানেও নিরাপদ না মনে করলে চূড়ান্ত ঠিকানা হয় পশ্চিমা বিশ্বের কোনো দেশ। যেখানে নির্বিঘ্নে বিনিয়োগ করা যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মোট দেশজ উত্পাদন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর সংগ্রহ ও বিনিয়োগ প্রবাহের উপর। ফলশ্রুতিতে আফ্রিকা থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী কমানো যাচ্ছে না দরিদ্র লোকের সংখ্যা, বাড়ছে আয়ের অসমতা এবং নষ্ট হচ্ছে চাকরি সৃষ্টির সম্ভাবনা। কেনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ডক্টর নুগুনা নদুগনু এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও শিল্পের বিস্তারের অনুপস্থিতিতে আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে বেকারত্বের হার খুবই উচ্চ এবং সহসাই তাতে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, আফ্রিকার একেকটি দেশ থেকে আসলে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে তা কিছুতেই বের করা সম্ভব না। ফিগার দাঁড় করানো হচ্ছে অনুমানের ভিত্তিতে।
২০১০ থেকে ২০১৮, এ সময়ে নাইজেরিয়া থেকে অর্থ পাচার হয়েছে কমপক্ষে ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যারা কি না আফ্রিকার বৃহত্ অর্থনীতির বিবেচনায় বছর দুয়েক আগে দখল করেছে। দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দক্ষিণ আফ্রিকা অর্থ পাচারের প্রশ্নেও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে যাদের ক্ষতি ১৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মিসর, আলজেরিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, অ্যাঙ্গোলা, সুদান ও ক্যামেরুন রয়েছে যথাক্রমে এর পরের অবস্থাগুলোয়। মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি ও অন্যান্য অসাধু ব্যবসায়ীরাই শুধু দায়ী নয়। অর্থ পাচারের পরিমাণের বিচারে আফ্রিকার অনেক দেশে তাদের হার মানিয়ে দেয় রাজনৈতিক নেতারা। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ সম্পর্কিত খবরাখবর গোপন থাকলেও পরবর্তীতে ঠিকই প্রকাশ পায়।
—আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে