কুমিল্লার তিতাসের কড়িকান্দির গর্ব ভাষা আন্দোলনের সৈনিক আবু যায়েদ শিকদারের বর্ণাঢ্য জীবনের ইতি ঘটল সোমবার। ওইদিন চিরতরে চলে গেলেন পর পারে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১১০ বছর। বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ ও গ্রন্থাকার আবু যায়েদ শিকদার ১৯২৯ সালে উপজেলার প্রাণকেন্দ্র কড়িকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম আবদুস সামাদ শিকদার।
আজ বুধবার বেলা ১১টায় জানাজা শেষে তাঁকে শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি তিন কন্যা ও দু’পুত্র রেখে গেছেন।
দেশপ্রেমে উদ্বুুদ্ধ আবু যায়েদ শিকদার ৫২’র ভাষা আন্দোলনে গৌরবময় ভূমিকার অধিকারী। তিনি ছিলেন একজন নির্ভিক ভাষা সৈনিক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক আমতলার সভায় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী প্রথম দশজনের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অপরাধে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে ৩৯ দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখে।
মেধাবী ও সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী আবু যায়েদ শিকদার ১৯৪৫ সালে ঢাকা মুসলিম হাইস্কুল হতে প্রথম বিভাগে মেট্রিক এবং ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। বহু আশা-আকাঙ্খা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলেও প্রতিকূলতার কারণে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আশা ছেড়ে পরবর্তী বছর গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন এবং সাফল্যের সাথে অনার্স ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মবীর, নিষ্ঠাবান ও সৃজনশীল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব আবু যায়েদ শিকদার প্রথমে সুনামগঞ্জ কলেজে শিক্ষকতা পেশায় চাকরি জীবন শুরু করেন। তারপর তিনি কিছুদিন চাঁদপুর কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি আনন্দমোহন কলেজে যোগদান করেন এবং ১৯৬৩ সালে ঐ কলেজের উপাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানটি দেশের একটি নামকরা কলেজ হলেও ১৯৬৪ সালে সরকারি করার কারণে তিনি সরকারি চাকরি করবেন না মর্মে সিদ্বান্ত নেন এবং তখনই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসাবে যোগদান করেন।
সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য এবং পরীক্ষা পরিচালনায় প্রশাসনিক পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ১৯৭৩ সালে কলেজ পরিদর্শক পদে নিযুক্ত হন। স্বীয় প্রতিভাগুণে তিনি ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবং ১৯৮৭ সালে রেজিস্ট্রার পদে উন্নীত হন।
আবু যায়েদ শিকদার উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। তাঁর রচিত গণিত বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকগুলোর মধ্যে ‘অ্যালজেব্রা ও ক্যালকুলাস’, বৈশ্লেষিক জ্যামিতি, An Introduction to Astronomy উল্লেখযোগ্য। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত প্রথম বাংলায় লিখিত ‘বিনোদন গণিত’ বইটি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রমজান আলী সরদারের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন। বাংলাদেশ গণিত সমিতির মুখপত্র ‘গণিত পরিক্রমা’ ও অন্যান্য ম্যাগাজিনে তাঁর অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আবু যায়েদ শিকদারের খ্যাতি রয়েছে। ১৯৮৫ সালে তিনি ওয়াশিংটনস্থ আন্তর্জাতিক শিক্ষা ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনামূলক প্রোগ্রামে সেখানকার পনেরটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের গৌরব অর্জন করেন। ১৯৫৭ সালে আনন্দ মোহন কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় তৎকালীন ইউটিসিতে যোগ দেন এবং ১৯৫৯ সালে বিটিএফ কমিশন লাভ করেন। তিনি বিটিএফ পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদ লে. কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৮০ সাল থেকে রমনা ব্যাটালিয়ন বিএনসিসি’র কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনসিসি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ২০০৮ সালে তিনি তমদ্দুন মজলিস ভাষা দিবস পুরস্কার লাভ করেন।
গৌরবময় কর্মজীবন ছাড়াও আবু যায়েদ শিকদার পারিবারিক পরিমণ্ডলেও একজন সফল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সুযোগ্য সহধর্মিণী মেহেরুন্নেছা হোমনা উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মৌলভী আলী আশ্রাফ সাহেবের কন্যা। তিন কন্যা ও দু’পুত্র সন্তানের অধিকারী।
ইত্তেফাক/এমআই