হত্যার আগে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নেয় পপি

ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ভাগনি(শ্যালিকার মেয়ে) উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পপি জানিয়েছে,  নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার আগে সে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় এবং পরে কিলিং মিশনেও অংশ নেয়।  গতকাল শুক্রবার রাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছে উম্মে সুলতানা পপি। এদিকে একই আদালত অপর আসামি জাবেদ হোসেনের আরও তিন দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেন। নুসরাত হত্যা মামলায় ৬ নং এজাহারভুক্ত আসামি জাবেদ হোসেন।  

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল এসপি মো. ইকবাল এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডে যে দুজন নারী সদস্য জড়িত ছিল উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা তাদের একজন। পপি আদালতের কাছে স্বীকার করেছে যে, সে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। পরবরতীতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।

এর আগে এই মামলার চারজন আসামি নুসরাত হত্যার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হলো মামলার এজহারভুক্ত আসামি নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আবদুর রহিম শরীফ ও হাফেজ আবদুল কাদের।

জানা গেছে, আলোচিত এই মামলায় এজাহারভুক্ত ৮ জনসহ এখন পর্যন্ত মোট ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে রয়েছে- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজউদ্দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, যোবায়ের হোসেন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, আবদুর রহিম শরিফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন।

নুসরাত হত্যার বর্ণনা দিল রিমান্ডে থাকা মণি

এদিকে রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সরাসরি অংশ নেয়া সহপাঠী কামরুন্নাহার ওরফে মণিকে নিয়ে ঘটনাস্থল ও বোরকার দোকান পরিদর্শন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

শুক্রবার দুপুরে পিবিআইয়ের একটি দল রিমান্ডে থাকা মণিকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেন, নুসরাত হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার কামরুন্নাহার ওরফে মণিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে একটি দল মণিকে নিয়ে সোনাগাজী পৌর শহরের মানিক মিয়া প্লাজায় একটি বোরকার দোকানে গিয়ে মালিকের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, পরে পিবিআইয়ের দলটি সোনাগাজী মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেখানে নুসরাতকে কিভাবে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে হত্যা করা হয়, তার বিবরণ দেন মণি।

 মো. শাহ আলম আরও বলেন, গ্রেফতার হওয়া মণির কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া পুরুষদের গায়ে থাকা বোরকাগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে এর আগেও ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এসময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় অধ্যক্ষের ভাগ্নি পপি। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যায় নুসরাত।