কাঠালিয়ায় নরসুন্দর পেশায় শেফালির জীবন যুদ্ধ

বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ আসন থেকে রান্না ঘর পর্যন্ত একজন নারীর বিচরণ। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে নারীদের সমান অবদান। সবকাজে নারীদের অংশগ্রহণ সমানভাবে থাকলেও নর সুন্দরের (নাপিত) পেশায় সাধারণত নারীদের দেখা যায় না। ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের বলতলা বাজারে দেখা গেল এক নারী নরসুন্দরের কাজ করছে।
 
কৌতূহল নিয়ে তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, কাঠালিয়ার পশ্চিম ছিটকী গ্রামের দরিদ্র যাদব শীলের চতুর্থ সন্তান শেফালি শীল। দারিদ্রতার কারণে ৫ম শ্রেণি পর্যন্তই লেখাপড়ার সুযোগ হয়েছে তার। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দরিদ্র পরিবারের চাপে বাধ্য হয়ে আতরআলী গ্রামের বিশ্বনাথ শীলের সঙ্গে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার। শুরু হয় দারিদ্রতার সঙ্গে মানিয়ে চলার জীবন যুদ্ধ। জীবনকে বুঝে উঠার আগেই ৪ মেয়ে ও ১ ছেলের মা হয় সে। একদিকে স্বামীর অবহেলা ও বেপরোয়া উদাসী জীবনযাপনের কারণে তার জীবন বিষিয়ে ওঠে। এত কিছুর পরেও হাল ছাড়েন না শেফালি। এরপর প্রথমে তার পিতার বাড়িতে থাকা শুরু করেন। এক সময় পিতার বাড়ি থেকে বলতলা গ্রামের দোগনা বাজারে চলে আসেন। সেখানে আসার পরও স্বামী কাজ করতেন। কিন্তু প্রায় ৬ বছর পূর্বে অর্থাৎ ২০১২ সালে স্বামী প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুুস্থ হয়ে পড়েন। অভাবের কারণে ভাল চিকিৎসা করাতে না পারায় একসময় তার স্বামী মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যান। এ অবস্থার কিছুদিনের মধ্যে তার স্বামী বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এরপর থেকেই ৫ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের দায়িত্বভার পুরোটাই শেফালিকে নিতে হয়।
 
পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য প্রথমে তিনি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করলেও সংসার যখন চলছিল না তখন তিনি ছেলেবেলায় পিতার বাড়ি থেকে শেখা চুল কাটার পেশা বেছে নেন। যখন তিনি গ্রামের বাজারে চুল কাটতে শুরু করে তখন গ্রামের কিছু লোক নারী বলে তার এই পেশায় আসাটাকে ভাল চোখে দেখেনি। গ্রামের বাজারের মধ্যে কোনো একজন নারী, পুরুষ লোকের চুল কাটছে দেখে অনেকেই অসহযোগিতা ও হাসি-ঠাট্টা করতে থাকে। অনেকে সমালোচনাও করতো। আবার গ্রামের কিছু লোক শেফালির অভাব দেখে সহযোগিতাও করেছে। এ সময় গ্রামের কিছু লোকজন টাকা তুলে চুল কাটার জন্য তাকে একটি চেয়ারও কিনে দেয়। কিন্তু এর পরেও সম্পদহীন জীবনে সে কোন স্বপ্ন দেখতে পারছিল না। জীবনের পথচলা যখন তার কাছে দুর্বিষহ ঠিক তখনই ২০১৬ সালে ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া ব্র্যাক অফিসের টিইউপি কর্মসূচির আওতায় জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে তিনি সদস্য নির্বাচিত হন এবং তার মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে গবাদী প্রাণী পালনের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে একটি বকনা গরু ও একটি ছাগল প্রদান করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সহায়ক ভাতা, হোম ভিজিটের মাধ্যমে ইস্যু শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শেখানো হয়। এরপর থেকে তিনি একটু একটু করে জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। শেফালির বাড়িতে এখন একটি গর্ভবতী গরু আছে যার আনুমানিক মূল্য ৪০ হাজার টাকা, তার ৩টি ছাগল ও ৩০টি হাঁস/মুরগি আছে। তার বড় মেয়েটি বি-এ (পাস কোর্স), ছেলেটি এইচএসসি আর বাকি ৩টি মেয়ে যথাক্রমে অষ্টম, সপ্তম ও প্রথম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছে। সে আগে অন্যের ঘরে বসবাস করতেন। এখন ব্র্যাক কর্মীদের অনুরোধে বলতলা জিডিবিসি কমিটি দোগনা বাজারের পাশে ৩ কাঠা খাস জমিতে শেফালিকে একটি ঘর তুলে দিয়েছে। শেফালি এখন সামাজিক ভাবে অনেক সচেতন। 
 
শেফালি তার ছেলে-মেয়েকে বাল্য বিয়ে দিবেন না বলে নিজে নিজে অঙ্গীকার করেছেন। তার মেয়েকে বিএ পাশ করার পর চাকরি করানোর স্বপ্ন দেখছেন। ব্র্যাক কর্মীরা তার সেলুনের বেশ কিছু প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে দিয়েছে। তিনি এখন গরু-ছাগল, হাঁস, মুরগি, লালন-পালনের পাশাপাশি দোকানে চুল কেটে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসার এবং সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালান। 
 
কাঠালিয়ার শৌলজালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদ হোসেন রিপন জানান, শেফালি আমাদের সমাজের অনুকরণীয় নারী জাগরণের দৃষ্টান্ত। লজ্জা এবং সমাজের ঠাট্টা উপেক্ষা করে তিনি এখন নারী সমাজের গর্ব। আমি তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি। 
শেফালি বর্তমানে জীবন যুদ্ধে হার না মানা একজন নারী। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক কন্ঠ। নারী হয়েও ব্যতিক্রমী পেশাগ্রহণ করে জীবন যুদ্ধে হার না মেনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত করেছেন কবির সেই কথাকে, বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। 
 
ইত্তেফাক/এমআই