তিন সিটিতে আজ ভোট

‘একদিকে উত্সব, অন্যদিকে উত্কণ্ঠা’-এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজ সোমবার বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে নাকি ফের জিতবে বিএনপি তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে ভোটার-কর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি বিভিন্ন  মহলে। 
 
কেননা ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত এই তিন সিটির ভোটে জিতেছিল বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীরা। তার আগে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা। যদিও বিগত নির্বাচনগুলো নির্দলীয় হলেও এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
 
জাতীয় নির্বাচনের পাঁচমাস পূর্বে অনুষ্ঠিত তিন সিটির ভোট বর্তমান কমিশনের অধীন বড় পরিসরে শেষ নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে মেয়র পদের জয়-পরাজয় নিয়ে হিসাব-নিকাশ কষছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সহজেই এজেন্ট নিয়োগ করতে পারলেও হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিপক্ষ শিবিরে। 
 
গত ১৫ মে খুলনা এবং সর্বশেষ গত ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটির ভোট নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি বর্তমান কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ফলে খুলনা ও গাজীপুর সিটির মতো নির্বাচন হবে নাকি শান্তিপূর্ণ ভোট হবে এ নিয়ে ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা কাজ করছে। বিশেষ করে ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত নির্বাচনী এলাকার সংশ্লিষ্টরা।
 
রবিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে দেখা করে বিএনপি অভিযোগ করেছে নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতা থাকলেও পুলিশ প্রশাসন তাদের কথা শুনছে না। তবে পাবনায় এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নির্বাচন ভালোই হবে। বিএনপি হারলে তারা নালিশ করবে। এতেই তারা সীমাবদ্ধ। তাদের এই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া দরকার। এই পরিস্থিতিতে আজকের তিন সিটির নির্বাচন ইসির কাছে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। তিন সিটির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। পাশাপাশি রয়েছে দেশীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। ইসির নিজস্ব পর্যবেক্ষকরা তো থাকছেই। সব মিলিয়ে কেমন ভোট হয় তিন সিটিতে সেজন্য উন্মুখ হয়ে আছেন দেশের সাধারণ মানুষ। কারণ এ নির্বাচনের ফলাফল বলে দেবে দৌরগড়ায় কড়া নাড়া আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে।
 
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কমিশন নভেম্বরের প্রথমভাগে তফসিল ঘোষণা করে ডিসেম্বরের শেষদিকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। ফলে জাতীয় নির্বাচনের আগে এই তিন সিটির ভোটই বর্তমান ইসির বড় পরিসরের স্থানীয় সরকারের কোন নির্বাচন। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসির সামনে বিশ্বাস অর্জন এবং আস্থা গড়ে তোলার শেষ সুযোগ এই তিন সিটির ভোট। 
 
নির্বাচনে ভোটাররা যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন-সেজন্য কমিশন সব কিছু করবে উল্লেখ করে ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারেন তা নিশ্চিত করা হবে।
 
এদিকে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তিন সিটির প্রতিটি কেন্দ্রে এরই মধ্যে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে গেছে। নির্বাচনের দিন ভোট দেয়ার সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বরিশালে ১১টি, রাজশাহীতে দুটি ও সিলেটে দুটি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে। তিন সিটির ৩৯৫টি ভোটকেন্দ্রের ৩০৬টি কেন্দ্রেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তিনি সিটিতে মোট ভোটার ৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৬জন।
 
তিন সিটি নির্বাচনে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। এ নির্বাচনে ভোটের আগের দুদিন থেকে ভোটের পরের দিন পর্যন্ত মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন থাকছে।
 
ইসি সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের মতো তিন সিটিতেও ভোট গ্রহণ পরিস্থিতির তথ্য তাত্ক্ষণিক জানার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে দুই ঘণ্টা পরপর প্রয়োজনীয় তথ্য ইসি সচিবালয়কে অবগত করবেন। কোনো কেন্দ্রে জাল ভোট বা সিল মারার ঘটনা ঘটলে বা তথ্য পেলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে কমিশন। ভোট কেন্দ্রে কোনো অঘটন বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তা তাত্ক্ষণিকভাবে কর্মকর্তারা এসএমএসের মাধ্যমে কমিশনকে জানাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কমিশন ঢাকায় বসে এসব এসএমএসের তথ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কার্যক্রমের গতি-প্রকৃতি, ভোটার, প্রার্থী-কর্মী-সমর্থকদের গতিবিধি এবং সর্বোপরি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনসহ সব কিছু সাধারণ পোশাকে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করবেন ইসির নীরব পর্যবেক্ষকরা। প্রতি তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে ইসির নিজস্ব পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটে কোনো ধরনের অনিয়ম দেখলে তাত্ক্ষণিক হস্তক্ষেপ, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনে তারা কমিশনকেও জানাবেন। তিনি সিটি নির্বাচন তিনজন নির্বাচন কমিশনার পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারকে বরিশাল, নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলামকে সিলেট এবং নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচন মনিটরিং করছেন।
 
তিন সিটির প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী
 
বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন-আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদেক আবদুল্লাহ (নৌকা), বিএনপির মো. মজিবুর রহমান সরোয়ার (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ওবায়দুর রহমান মাহবুব (হাতপাখা), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির আবুল কালাম আজাদ (কাস্তে), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মণীষা চক্রবর্তী (মই), জাতীয় পার্টি-জাপা প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন (লাঙ্গল) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বশীর আহমেদ ঝুনু (হরিণ)।
 
রাজশাহী সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন-আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন (নৌকা), বিএনপির মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. শফিকুল ইসলাম (হাতপাখা),  স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মুরাদ মোর্শেদ (হাতি) ও মো. হাবিবুর রহমান (কাঁঠাল)।
 
সিলেট সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন-আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বদর উদ্দীন আহম্মদ কামরান (নৌকা), বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান (হাতপাখা), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের-বাসদ মো. আবু জাফর (মই) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসান মাহবুব জোবায়ের (টেবিল ঘড়ি), মো. এহসানুল হক তাহের (হরিণ) ও মো. বদরুজ্জামান সেলিম (বাস)। তিন সিটিতে ৫৩০ জন কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
 
ইত্তেফাক/কেআই