কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সিলেট নগরীতে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে। পুলিশের ফাঁকা গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ, ব্যালট ছিনতাই, সংঘর্ষ, জাল ভোট প্রয়োগসহ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে সিসিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়। দিনের প্রথম দিকে সর্বত্র শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট গ্রহণ শুরু হলেও বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঙ্গামার ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলিতে দু’প্রার্থীর দু’জন সমর্থক ও অপর সংঘর্ষে একজন ম্যাজিস্ট্রেট আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। গোলযোগের কারণে দু’টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছেন নির্বাচন কমিশন।
এদিকে বিএনপি‘র মেয়র প্রার্থীর আরিফুল হক চৌধূরী দুপুরেই নির্বাচন বাতিলের দাবি করেন। পরে বিকাল ৪ টার দিকে ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে সিসিক নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেনে তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সিলেটে ভোট হয় নাই, ডাকাতি হয়েছে। এই নির্বাচন প্রত্যাখান করলাম। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হতাম। তিনি আরও বলেন, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে কিনা ২০ দলীয় জোটের চিন্তা করা দরকার।
শেষ খবর পর্যন্ত ভোট গণনা চলছে এবং কোন কোন কেন্দ্রের ফলাফল পেয়ে প্রার্থী ও সমর্থকরা উল্লাস করতে থাকে। সর্বশেষ রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধূরী ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
পুলিশের গুলিতে দুজন আহত:
১৯ নং ওয়ার্ডের বখতিয়ার বিবি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলারের কেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে বেলা সোয় ১টার দিকে গোলযোগের ঘটনা ঘটে। তখন পুলিশ গুলি ছুড়লে সেখানে দুজন আহত হন। এ সময় দু’ ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল। ১৮ নং ওয়ার্ডের ঝর্ণারপাড়ে কাজী জালাল উদ্দিন বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দিতে গেলে সেখানে বেলা ১১ টায় সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় একজন ম্যাজিস্ট্রেট আহত হন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে। স্থানীয়রা জানান কেন্দ্রটিতে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা কেন্দ্রটি দখল করে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাঁধে। অপর এক সূত্র জানায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সেখানে ধানের শীষে ভোট দিতে থাকে যুবকরা। তখন সংঘর্ষ বাঁধে।
এ দিকে জাল ভোটের অভিযোগে খাসদবীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০ মিনিট ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকার পর ফের শুরু হয় ভোট গ্রহণ। বেলা ১১ টার দিকে মেয়র প্রার্থী কামরান ঐ কেন্দ্রে গেলে সেখানে যুবদল নেতা সাহেদ আহমদ চমন কামরানের সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়িত হন। এক পর্যায়ে চমন নাকি কামরানকে ধাক্বা দেন। তখন সেখানে উত্তপ্ত পরিরিন্থিতি বিরাজ করে। পরে ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটলে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ১০টায় দিকে নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের খাসদবীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাল ভোটের অভিযোগ করেন বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্টরা। একই সময়ে এই কেন্দ্রে কাউন্সিল প্রার্থী রিয়াদ আহমদ রুবেলের বিরুদ্ধে জাল ভোট প্রদানের অভিযোগ করেন ধানের শীষের এজেন্ট দাওয়াত খন্দকার। ১০টার দিকে মেয়র প্রার্থী কামরান এই কেন্দ্রে আসার পর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এসময় জাল ভোটের অভিযোগে কয়েকটি ব্যালট পেপার ছিঁড়ে ফেলেন বিক্ষুব্ধরা। তখন কেন্দ্রে উপস্থিত হন নির্বাহী ম্যাজিস্টেট সহ বিপুল সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রিজাইডিং অফিসার ছয়ফুল আলম চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ৫০ মিনিট কেন্দ্রটিতে ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকার পর ফের শুরু হয় ভোট গ্রহণ।
৭ কাউন্সিলার পদ প্রার্থীর নির্বাচন বয়কট:
অনেক কেন্দ্রে প্রার্থীর সমর্থকরা ব্যালেট ছিনিয়ে নিয়ে নিজ পক্ষে ভোট দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগ বেশীর ভাগ কাউন্সিলার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। ২২ নং ওয়ার্ডের উপশহর ব্যাংক স্কুল কেন্দ্রে কাউন্সিলার পদ প্রার্থী মো. আবু জাফর বেলা ১১ টায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। তিনি বিষয়টি লিখিত ভাবে রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়েছেন। ঐ কেন্দ্রে একজন প্রভাবশালী কাউন্সিলারের লোকজন ৬০-৭০ টি ব্যালেট পেপার নিয়ে সিল মেরেছে। এ ঘটনার পর ঐ ওয়ার্ডের ৭ জন কাউন্সিলার প্রার্থী নির্বাচন বয়কট করেছেন- সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন, দিদার হোনেন,রুবেল,সাদেক হোসেন, ফজলে রাব্বি চৌধূরী।
ব্যালেট ছিনতাই:
হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ব্লু-বার্ড হাই স্কুল এন্ড কলেজে ব্যালেট পেপার ছিনতইর ঘটনা ঘটে। বেলা ১২ টার দিকে হবিনন্দি সরকারী প্রাথমিক স্কুলে নৌকার সমর্থকরা ভোট কেন্দ্রে ঢুকে ‘সিল’ মারতে থাকলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দেয়। তখন ক্ষুব্ধ হয়ে তারা কেন্দ্রের বাহিরে গিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এক পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেন। একই সময়ে ব্লু-বার্ড স্কুলের পুরুষ কেন্দ্রের ২ নং বোথে ঢুকে কয়েকজন যুবক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের নিকট থেকে কাউন্সিলার প্রতীকের বই নিয়ে সিল মারা চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর বাধার মুখে ৭০ টি ব্যালট পেপার সহ তারা পালিয়ে যায়। এসময় সেখানের ১ ও ২নং বোথে আধা ঘন্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল। এসময় বাহিরে অপেক্ষরত ভোটারগণ আতংকি হয়ে ভোট না দিয়ে চলে যান। বেলা ১২ টায় জহির তাহির স্কুল থেকে বিএনপির এজেন্ট লিটনকে নৌকার সমর্থকরা বের করে দেয় বলে লিটন জানান।
ইত্তেফাক/এমআই