যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে পুরো বাংলাদেশ এসেই যেন মিশে গিয়েছিলো ঢাকার শাহবাগে। উত্তাল হয়ে ওঠেছিলো রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে। আর সেই ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিলো দেশের আনাচে কানাচে, অলি গলির পথেও। ভিন্ন মত, ভিন্ন পথের সবারই যেন একটাই দাবি ছিলো রাজাকারদের ফাঁসি। দিনরাত এক করে সর্বস্তরের মানুষ অবস্থান নিয়েছিলো শাহাবাগে। বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলো বাঙালি আন্দোলন করতে জানে। বাঙালি দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সফলতাও এসেছে সেই আন্দোলনের ফলে। শীর্ষ রাজাকারদের বিচার হয়েছে। কলঙ্কমুক্ত হয়েছিলো জাতি। এবার সেই উত্তাল শাহবাগের আরেক রূপ যেন দেখা গেল নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায়। কে কোন দলের, কে কোন মতে, কে কোন পথের? এসব হিসেব নিকেশ নেই এখানে। দলে দলে এসে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জড়ো হচ্ছে ‘নিরাপদ সড়ক’ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। আর এই দৃশ্যকে অনেকেই বলছেন, ‘চাষাড়া যেন সেই উত্তাল শাহাবাগের নতুন ঢেউ’।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাওয়া নেই, ধাওয়া নেই, রোদ কিংবা বৃষ্টি নেই, সড়কের নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীরা চালিয়ে যাচ্ছে তাঁদের আন্দোলন। এতো শিক্ষার্থী একসঙ্গে নেমে আসাকে অনেকে আবার তুলনা করছে সেই ৫২’র সঙ্গে। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসেও এ যেন নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে এই আন্দোলন যেন নিজের তাগিদেই। নিজের জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে। তবে, অনেকে আবার বলছে, সড়ক ব্যবস্থার বেহাল অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মাঝে যেই ক্ষোভ এতোদিন দানা বেঁধেছিলো সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই কোমলমতি এই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।
এদিকে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন কতটা সফল হবে বা শান্তিপূর্ণ থাকবে কিনা সে নিয়ে অভিভাবক মহলের মাঝেও রয়েছে সন্দেহ। তবে শিক্ষার্থীরা বলছে, ছাত্র আন্দোলন কখনো বৃথা যায়নি এবারও বৃথা যাবে না। আমরা ৫২তে জিতেছি এবারও জিতবো।
কুর্মিটোলায় দুই বাসের রেশারেশিতে নৌপরিবহন মন্ত্রীর শ্যালকের মালিকানাধীন পরিবহন জাবালে নূর দুই শিক্ষার্থীর ওপর উঠিয়ে দেয়। ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ছাত্র জনতা। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সর্বস্তরের মানুষ। এমন এক পরিস্থিতিতে সাংবাদিকেরা এ ঘটনা সম্পর্কে নৌপরিবহন মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি হাসি ঠাট্টার ছলে উত্তর দেন। এতে করে গণমানুষের ক্ষোভের আগুন আরও বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। চারিদেকে দাবি ওঠে নৌপরিবহন মন্ত্রী পদত্যাগের।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকার রাজপথে বিচার দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলো তখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ববর্র হামলা চালায় পুলিশ। যা অনেকেই ৫২'র পুলিশের আচরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধে শিক্ষার্থীদের মাঝে। যার ফলশ্রুতিতে চলমান আন্দোলনে বাঁধ ভাঙা জোয়ার হয়ে ওঠেছে।
পুলিশের গাড়িও ছাড় নেই
শুধু বিক্ষোভই নয় বরং শহরের চাষাড়ায় বিভিন্ন যানবাহন আটকিয়ে চালকদের লাইন্সে চেক, গাড়ি রিক্সা চলাচলে শৃঙ্খলাতেও কাজ করেছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও তাঁরা রাস্তা দখল করে অবৈধভাবে গণপরিবহনগুলো সরিয়ে নিতেও সবাইকে আহ্বান করছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চাষাড়া, খানপুর, মেট্রো হল চত্বরসহ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। আর এসব ঘটনা কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের সামনেই ঘটেছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা পুলিশের গাড়ি চালকের লাইসেন্স চেক করা থেকেও বিরত থাকেনি।
এদিকে কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় দিনে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায়শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা স্রোত নেমেছে। বিভিন্ন স্থান থেকেই পায়ে হেঁটে ছাত্র ছাত্রীরা এসে অংশ নিচ্ছে আন্দোলনে। পরিবারের অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে আন্দোলনে আসা অনেক শিক্ষার্থীই জানিয়েছে, তাঁরা বাবা-মা’র কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই অধিকার তথা নিরাপদ ‘সড়ক চাই’ আন্দোলনে এসেছে। এখানে তাঁরা কারো প্ররোচনায় নেমে আসেনি বলেই জানায়।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে গত বুধবারের মতো গতকালও ঢাকা থেকে কোনো যানবাহন আসতে ও যেতে পারেনি। বলা চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধের কারণে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে অন্য জেলার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তাঁরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত পুলিশ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনোরকম মারমুখি আচরণ করেছে বলে খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে দুপুরে শহরের চাষাঢ়া এলাকায় সেচ্ছাসেবকলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল ৪ আসনের এমপি পংকজ দেবনাথ এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার গাড়ি আন্দোলনকারীদের কবলে পড়ে। এই সময় তারা ড্রাইভারের লাইসেন্স পরীক্ষা করে। এমপি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের গাড়ির ড্রাইভারের লাইসেন্স থাকার কারণে তাদের ছেড়ে দিলেও তিন থানার ওসির ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকায় তাদের আটকিয়ে রাখে।
পুলিশের লোক বলে, আইডি কার্ড দেখিয়েও পার পায়নি তারা। লাইসেন্স না থাকাতে জব্দ করা হয়েছে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানসহ ৩টি মোটরসাইকেলের চাবি। বন্দর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার চাবি জব্দ করার সময় নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিলে শিক্ষার্থীরা বলে, ‘পুলিশ হয়ে আপনারা লাইসেন্স করেন না তাহলে সাধারণ মানুষ কেন করতে যাবে। যারা শৃঙ্খলা রক্ষা করবে তাদেরই যদি শৃঙ্খলা না থাকে তখন এসব দুর্ঘটনা অবধারিত।’ এসব কথা শোনার পর চাবি দিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা চলে যান। জব্দকৃত গাড়ির চাবির মধ্যে পুলিশের গাড়ি ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি, বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাবি। এদিকে লাইসেন্স চেক করা হচ্ছে বলে, গতকাল সারাদিন শহরে গাড়ির সংখ্যা কম দেখা গিয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু