ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া ন্যাশনাল হাইওয়ে টুয়েন্টি ফোরের ব্যস্ত মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্রসিং খোডা, ইন্দিরাপুরম আর দিল্লিগামী সড়কের ত্রিমুখী মোড়। সেখানে পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন মহিলা হাতে স্রেফ একটা লাঠি আর গলায় হুইসল ঝুলিয়ে ট্রাফিক সামলাতে দেখা যেতো।
এই নারীর নাম ডরিস ফ্রান্সিস। ওই রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াতকারীরা ‘ডরিস আন্টি’ নামেই চেনেন তাকে। সালোয়ার-কুর্তা আর কখনো মাথায় একটা টুপি কখনো কিংবা গায়ে জড়ানো একটা ফ্লুরোসেন্ট জ্যাকেট নিয়েও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নেমে পড়তেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে একটানা ওই ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
সাঙ্ঘাতিক অসুস্থ হয়ে না-পড়লে এই প্রতিদিনই মোড়ে হাজির হতেন ডরিস। মরনব্যাধি ক্যানসারে শয্যাশায়ী হওয়ার আগে পর্যন্ত টানা সাত-আট বছর ধরে এই কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি।
IMG0
যখন কিছুটা সুস্থ ছিলেন তখন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার এই অদ্ভুত কাজের ঘটনা নিয়ে কথা বলেন। জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মেয়ের আত্মাকে শান্তি দিতেই এ রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন তিনি।
ডরিস বলেছিলেন, ঘটনাটা ২০০৮ সালের। মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে একটা অটোতে (সিএনজি) চেপে আমরা যাচ্ছিলাম এন এইচ টোয়েন্টি ফোর দিয়েই। এমন সময় গাজিয়াবাদের দিক থেকে একটা ওয়াগন-আর গাড়ি তীব্র গতিতে এসে সোজা ধাক্কা মারে আমাদের অটোতে। আমরা তিনজন তিনদিকে ছিটকে পড়ি।
তিনি বলেন, আমি আর আমার স্বামী দুজনেই গুরুতর জখম হয়েছিলাম - কিন্তু সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক অবস্থা ছিল আমাদের সতের বছর বয়সী মেয়ে নিকির। ধাক্কার আঘাতে ওর ফুসফুসে মারাত্মক চোট লেগেছিল, শরীরের নানা অংশ বেরিয়ে এসেছিল পর্যন্ত!
এর পর টানা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিকি হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিল - তবে তাকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু নিজের মেয়ের স্মৃতি ভুলতে পারেননি ডরিস। স্থির করে ফেলেন, যেখানে বেপরোয়া ট্র্যাফিকের কারণে তার নিকি চিরতরে হারিয়ে গেছে সেখানে তিনি নিজেই ট্র্যাফিক সামলানোর ভার হাতে তুলে নেবেন।
IMG1
ডরিস বলেন, আমার খালি মনে হত, সেদিন যদি ওই মোড়ে একজন ট্র্যাফিক পুলিশ থাকত তাহলে ওয়াগন-আর গাড়িটা অত জোরে ছুটে আসার কথা হয়তো ভাবতেই পারত না। হয়তো বেঁচে যেত নিকির জীবনটা! এখন ওই ক্রসিংয়ে আমি নিজেই দাঁড়িয়ে যদি বেপরোয়া যানবাহন সামলাতে পারি, তাহলে হয়তো কয়েকটা জীবন নিশ্চয় বাঁচাতে পারব। মৃত্যুর ওপারে গিয়ে নিকি এর চেয়ে বেশি শান্তি কিছুতেই পাবে না।
তিনি জানান, প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও, একসময় মানুষ তার কথা মানতে শুরু করে।
তার এই নি:স্বার্থ সেবাকে স্বীকৃতি দিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষও। গাজিয়াবাদের পুলিশ প্রধান আকাশ টোমার বলেন, ওনি একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের ট্রাফিক পুলিশের পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছেন বহু বছর ধরে। খোডা-ইন্দিরাপুরম ক্রসিংয়ে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কমে যাওয়ার পেছনে ডরিস ফ্রান্সিসের যে বিরাট অবদান আছে তা স্বীকার করতে আমাদের কোনও দ্বিধা নেই।
কয়েক মাস আগে দুরারোগ্য ক্যানসার ডরিস ফ্রান্সিসের জীবনীশক্তি অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে - এখন আর তিনি আগের মতো লাঠি হাতে আর হুইসল ঝুলিয়ে এন এইচ টুয়েন্টি ফোরের মোড়ে এসে দাঁড়াতে পারেন না। বিবিসি বাংলা।
ইত্তেফাক/ জেআর