সামাজিকভাবে এদের প্রতিহত করুন

ড. মিল্টন বিশ্বাস

চলতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের নাম-পরিচয়, চেহারা ভালোভাবে প্রচার করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রায়ই দেখি শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ, এটা অত্যন্ত গর্হিত একটা কাজ। যারা এসব করে তারা সমাজের শত্রু, তাদের প্রতি ঘৃণা। তাঁর মতে, শুধু আইন করলে নারীর প্রতি সহিংসতা বা বৈষম্য দূর হবে না। এজন্য সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্তভাবে দরকার। 

নারীর অসম্মতিতে যৌন মিলনে বাধ্য করাকে ধর্ষণ বলা হয়। তবে শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে সম্মতি-অসম্মতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা স্পষ্টত গুরুতর বা মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক সংবাদ থেকে জানা যায়, নিকটজনরা ধর্ষণ করছে নারীকে। গৃহকর্তা, তার ছেলে, বয়ফ্রেন্ড, স্বামী এবং আত্মীয় দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছেন নারী। সংখ্যাগত দিক থেকে সব ধর্ষণের ঘটনার অর্ধেকই ঘরের মধ্যে হয়ে থাকে। ধর্ষণকারীর কোনো বয়স, ধর্ম-বর্ণ, সামাজিক মর্যাদা নেই; সে পথে, গাড়িতে, অফিসে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পার্কে সর্বত্রই ঘাপটি মেরে বসে আছে। কেবল নারী নয়, পুরুষও পুরুষ কর্তৃক ধর্ষিত হচ্ছেন।

প্রকৃতভাবে রেপ আবেগের বিষয় নয়, এটি নারীর প্রতি সহিংস শত্রুতা। পঞ্চাশ শতাংশ রেপ গৃহে হয়ে থাকে। এজন্য নির্জন স্থানে ও অন্ধকারে রেপ হয়, এটা সত্য নয়। অধিকাংশ রেপ দিনের আলোতে হয়। বেশির ভাগ ধর্ষণকারী ধর্ষিতার পূর্বপরিচিত। এদের অনেকেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অপরাধ করে। দেশব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন ধর্ষিতা বিষয়টি পুলিশে রিপোর্ট করেন। ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি ধর্ষিতার আর্থ-সামাজিক মর্যাদা, বয়স ও রূপের সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়। দেশের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনার ব্যাপকতা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, গ্রাম এবং নগরের নারী ও শিশুদের সচেতনতার অভাবে ধর্ষণের সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। দারিদ্র্য ও বিনোদনের অভাব একে অপরের পিঠে ভর করে ধর্ষণের প্রকোপ বৃদ্ধি করছে। তবে ১০ এপ্রিল মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের মারা যাওয়া এবং যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত এদেশের আপামর মানুষের প্রতিবাদ সমাজের ইতিবাচক দিক। অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোরতা প্রদর্শন আর প্রতিটি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় এদেশ এখন ধর্ষকমুক্ত সমাজে পরিণত হতে যাচ্ছে।

জনসচেতনতা ধর্ষণ নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন, একসময় দেখা গেছে, বেকার সমস্যা এবং গৃহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও অফিসে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা না চালানোর কারণে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সরকারের নারী নেতৃত্বের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ধর্ষণকারীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে নারী বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আমাদের সামনে তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ধর্ষণ প্রতিরোধ এবং নির্মূলে করণীয় সম্পর্কে আমাদের অভিমতগুলো নিম্নরূপ। দরজায় আই-ভিউয়ার লাগান। দরজা খোলার আগে জেনে নেবেন কে আছে দরজার বাইরে। পরিচয় ছাড়া টেলিফোনে নির্বিঘ্নে প্রশ্নের উত্তর দেবেন না। গৃহের কাজে আসা প্রত্যেকের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে কাজে নিযুক্ত করুন। ঘরের বাইরে বের হলে আলোকিত ও ভালো রাস্তা ব্যবহার করতে হবে। সম্ভব হলে সঙ্গীসহ হাঁটতে হবে। জনগণের ভেতর দিয়ে চলাচল করা নিরাপদ। প্রতিবেশীদের চিনে রাখতে হবে। সম্ভব হলে হাতব্যাগ বহন না করাই ভালো। কাউকে পরোয়া না করে চারদিকে নজর রেখে চলতে হবে। যদি মনে হয় আপনাকে কেউ অনুসরণ করছে, তাহলে দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে নিকটস্থ শপিং অথবা উন্মুক্ত স্থানের হকারদের সামনে চলে যাবেন। গাড়ি ড্রাইভ করলে গাড়ির চাবি সর্বদা নিজের কাছে রাখুন। গাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ রেখেই গাড়ি থেকে বের হন। গাড়িতে প্রবেশের সময় এটির পেছনের সিট ও নিচের দিক দেখে নিন; পার্ক করুন আলোকিত ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার পার্কিং স্পটে। পার্কিং এলাকা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। অপরাধীরা গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে।

নতুন কারো সঙ্গে প্রথম দেখা করতে গেলে সঙ্গে কাউকে নিয়ে যাবেন। নিজের গাড়ি থাকলে তা ব্যবহার করুন এবং ক্লাব কিংবা রেস্টুরেন্টে বসুন। হিতাহিত জ্ঞান বজায় রাখার জন্য মদ্যপান পরিহার করুন। নির্জন লিফটে অপরিচিত পুরুষ আপনাকে আক্রমণ করতে পারে—এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন। আত্মরক্ষার বিবিধ বিষয় আছে, তবে সশস্ত্র ব্যক্তির কাছ থেকে রক্ষার জন্য অন্যপন্থা গ্রহণ করতে হবে। ধর্ষিতা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়ে জখম হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বলতে পারেন, আপনি গর্ভবতী, মাসিক চলছে, সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তার হাত থেকে পালানোর জন্য সুযোগ খুঁজতে পারেন। বমির উপক্রম, টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন জানাতে পারেন। তবে পরিস্থিতি ভেদে এ ধরনের কাজের প্রচেষ্টা কার্যকর নাও হতে পারে, সেক্ষেত্রে সক্রিয় আত্মরক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। একটি বাঁশি আপনাকে রক্ষা করতে পারে।

শিশুরা স্কুলে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে নিরাপদ পথ ব্যবহার করবে। নির্জন এলাকা বর্জন করবে। উঠতি বয়সীরা গৃহকর্মে নিযুক্ত হবে গৃহকর্তা সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিয়ে। কাজের মেয়ে-সংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে। তবে শিশুদের মা-বাবাও নিজেদের কন্যাশিশুর বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে যেকোনো ঘটনা সামাল দেওয়ার জন্য। দেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ আছে। সে আইনের সহায়তা ছাড়াও নারী-শিশুকে সতর্ক থাকার জন্য উপরের বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হলো।

তবে এ কথা সত্য যে, পুরুষরা পারে ধর্ষণ বন্ধ করতে। পুরুষত্ব বিষয়ে সচেতন করতে হবে পুরুষকে। সরকার কঠোর শাস্তির বিধান রেখে বেশ কিছু আইন কার্যকর করেছে এবং আরো কিছু কার্যক্রম নারীদের সহায়তার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। সারা দেশে ৪ হাজার ৮৮৩টি ক্লাবের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা গ্রহণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ‘অ্যাকসেলারেটিং অ্যাকশন টু অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা প্রদানে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রম ধর্ষকদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যথেষ্ট। এদেশে ধর্ষকদের ঠাঁই নেই।

n লেখক : অধ্যাপক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়