পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় অশ্রুভেজা নয়নে পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে আরাফাত ময়দানে অবস্থানের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার পবিত্র হজ পালন করেছেন গোটা দুনিয়া থেকে আগত প্রায় ত্রিশ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আরাফাতের পাহাড় ঘেরা ময়দান ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস মুখর ও প্রকম্পিত হয়েছে আবেগাপ্লুত বেশুমার কণ্ঠের ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বা, লা-শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নে’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লাশারিকা লাক’-তালবিয়ায়। এক অপার্থিব আবহ রচিত হয় পুরো ময়দানে। সবার পরনে সাদা দুই খণ্ড বস্ত্র। সবারই দীন-হীন বেশ। নেই আশরাফ-আতরাফ বিভেদের অচলায়তন। গতকাল দুপুরে সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর আরাফাতের ময়দান সংলগ্ন মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেওয়া শুরু করেন মসজিদে নববির সিনিয়র ইমাম ও খতিব, মদিনা সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি শায়খ ড. হুসাইন আশ শায়খ। ৩১ মিনিটব্যাপী খুতবায় তিনি মানুষের চারিত্রিক উন্নতির গুরুত্ব সম্পর্কে বয়ান করেন। মানুষের ঈমান আমল বৃদ্ধি ও নেক কাজের আদেশ এবং অসত্ কাজের নিষেধের তাগিদ করেন। তিনি বলেন, মুসলিম উম্মাহ এখন কঠিন সময় পার করছে। অনৈক্য মুসলিম জাতির অন্যতম ব্যাধি। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের জন্য চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে ঐক্যকে সুসংহত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথানত করা যাবে না। হজের খুতবা সমাপ্ত হবার পর ইমামের পেছনে পরপর জোহর ও আসরের নামাজ জোহরের ওয়াক্তে আদায়ের পর সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন হাজিরা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মেহমানরা গতকাল সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে কেউ গাড়িতে, কেউ পায়ে হেঁটে আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হন। আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ‘ফরজ’ বা অবশ্য পালনীয়। মূলত ৯ জিলহজ আরাফাতে অবস্থান করার দিনকেই হজের দিন বলা হয়। জনশ্রুতি আছে যে, হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) দীর্ঘদিন কান্নাকাটির পর এখানেই এসে মিলিত হয়েছিলেন। হাজিরা আরাফাত ময়দানে অবস্থান শেষে তাদের গন্তব্য মুযদালিফা। সেখানে গিয়ে মাগরিব ও এশা’র নামাজ এশা’র ওয়াক্তে একত্রে পড়বেন এবং সমস্ত রাত অবস্থান করবেন।
মিনায় জামরাতে নিক্ষেপ করার জন্য ৭০টি কংকর এখান থেকে সংগ্রহ করবেন। মুযদালিফায় ফজরের নামাজ পড়ে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। ১০ জিলহজ মিনায় পৌঁছার পর হাজিদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে মিনাকে ডান দিকে রেখে হাজিরা দাঁড়িয়ে শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ করবেন। দ্বিতীয় কাজ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। অনেকেই মিনায় না পারলে মক্কায় ফিরে গিয়ে পশু কোরবানি দেন। তৃতীয় পর্বে মাথা ন্যাড়া করা। চতুর্থ কাজ তাওয়াফে জিয়ারত। হাজিরা মক্কায় ফিরে কাবা শরীফ ‘তাওয়াফ’ ও ‘সাঈ’ (কাবার চারদিকে সাতবার ঘোরা ও সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌঁড়ানো) করে আবার মিনায় ফিরে যাবেন। জিলহজের ১১ তারিখ মিনায় রাত যাপন করে দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হাজিরা বড়, মধ্যম ও ছোট শয়তানের উপর সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন। আর এ কাজটি করা সুন্নত। পরদিন ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে পুনরায় একইভাবে হাজিরা তিনটি শয়তানের উপর পাথর নিক্ষেপ করবেন। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা শেষ হলে অনেকে সূর্যাস্তের আগেই মিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। আর মক্কায় পৌঁছার পর হাজিদের একটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। সেটি হচ্ছে কাবা শরীফ তাওয়াফ করা। একে বলে বিদায়ী তাওয়াফ। স্থানীয়রা ছাড়া বিদায়ী তাওয়াফ অর্থাত্ কাবা শরীফে পুনরায় সাতবার চক্কর দেয়ার মাধ্যমে হাজিরা সম্পন্ন করবেন পবিত্র হজব্রত পালন।
ইত্তেফাক/নূহু