অবশেষে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তেলের চালান ও আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আগামী জুন মাসেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হতে যাচ্ছে। তেলের চালানসহ সার্বিক পরিচালন কাজও এ বছরের মধ্যেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। অটোমেশন চালু হলে তেল চুরি ও আর্থিক অনিয়ম রোধ করার পাশাপাশি বিপণন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে দ্রুত পাওনা টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান বলেন, অটোমেশনের প্রয়োজনীয়তা আমরা অনেকদিন ধরে অনুভব করছি। স্থানীয় একটি কোম্পানি ইতোমধ্যে অটোমেশন সফটওয়্যার ডেভেলপ করার কাজ শুরু করেছে। জুনের মধ্যে অটোমেশন পদ্ধতিতে আর্থিক হিসাব পরিচালনা করা যাবে বলে আশা করছি।
বিপিসিসূত্র জানায়, বর্তমানে বিপিসির হিসাব পরিচালনা, তেল আমদানি ও বিপণনসহ সকল কাজ সনাতনী পদ্ধতিতে কাগজে লিখে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস (সিএনএস) অটোমেশন সফটওয়্যারটি তৈরির কাজ পেয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা ছাড়াই সিএনএসকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন করে বিপিসি। বাংলাদেশ পরিচালিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থা-কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিপিসির লেনদেনের পরিমাণই সবচেয়ে বড়। দীর্ঘদিন ধরেই বিপিসি ও পেট্রোবাংলার লেনদেন অটোমেশন পদ্ধতিতে করার জন্য বলে আসছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। পেট্রোবাংলায় এখনো অটোমেশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেরিতে হলেও এবার বিপিসি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে হিসাব পরিচালনা করতে যাচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল চুরি হচ্ছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে তেল চুরি নিয়ে ইত্তেফাকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুল পরিমাণ তেল চুরির তথ্যও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে নিজের আওতাধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওনা টাকা সময়মতো আদায় করতে পারে না বিপিসি। এ সকল অনিয়ম ও অসংলগ্নতা দূর করে বিপিসির কার্যক্রমে গতি আনতে অটোমেশন ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসির চেয়ারম্যান জানান, শুধু আর্থিক লেনদেন নয়, তেলের চালানসহ সার্বিক অপারেশনও অটোমেশন পদ্ধতিতে পরিচালিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিপিসির কাজের গতি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। বিপিসির অপারেশন অটোমেশন পদ্ধতিতে পরিচালনার জন্যও সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। স্প্যানিশ কোম্পানি টেকনিকারকে ওই সফটওয়্যার তৈরির কাজ দেওয়া হয়েছে। তারা সাড়ে চার মাসের মধ্যে সফটওয়্যারটি তৈরির কাজ শেষ করবে।
এ সফটওয়্যার চালু হলে আমদানি-উত্পাদন থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যায় পর্যন্ত তেল লোড-আনলোড (জাহাজে ভরা ও ডিপোতে এবং গাড়িতে খালাস) করার হিসাব স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হবে।
বিদেশ থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দেশের বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যহার অনুযায়ী বিক্রি করে বিপিসি। ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ—কয়েক বছর আন্তর্জাতিক দরের চেয়ে বেশি দরে তেল বিক্রি করে আগের লোকসান কাটিয়ে উঠে বিপিসি। এ সময় বিপুল মুনাফাও গুনে সংস্থাটি। তবে সম্প্রতি ফের লোকসান গুনছে বিপিসি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অটোমেশন চালু হলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় তেলের বাজার পরিচালনা করা সহজ হবে। আর্থিক অনিয়মের আশঙ্কাও কমবে।
গত বছর ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস এবং জেট ফুয়েলসহ ৬৭ লাখ টন তেল আমদানি করে বিপিসি। চলতি বছর ৭৫ লাখ টন আমদানি করা হতে পারে। দেশে বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোল ৮৬ টাকায়, অকটেন ৮৯ এবং কেরোসিন ও ডিজেল ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যবহূত প্রতি ইউনিট ফার্নেস তেলের দাম ৪২ টাকা। প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ৭২ টাকা।