কোরবানীর চামড়া সরবরাহ খুবই কম, মৌসুমী ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

প্রতি বছর কোরবানির ঈদের পর জমে ওঠে কাঁচা চামড়ার ব্যবসা। ট্যানারি শিল্পে ধুম পড়ে যায় চামড়া ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ ও পরিবহনের। ট্যানারি শ্রমিকদের দম ফেলার ফুসরত থাকে না এ সময়। কিন্তু এবার অনেকটাই ব্যতিক্রম সাভার চামড়া শিল্প নগরীর চিত্র।
 
ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের ফলে চামড়ার মূল্যের ব্যাপক দরপতন হওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের। আর এর প্রভাব পড়েছে ট্যানারি শিল্পে। অপরদিকে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুর-দুরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীরা। এর ফলে ট্যানারিতে চামড়া সরবরাহ ছিলো খুব কম।
 
এছাড়া ঈদ মৌসুমে বিভিন্ন ট্যানারীতে চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করতে আসা শ্রমিকদেরও দুর্ভোগের কমতি নেই। নেই পর্যাপ্ত খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রামের সুযোগ। শ্রমিকরা অসুস্থ্য হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ারও কোন ব্যবস্থা নেই সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে। সারাদিন স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে কাজ করার ফলে ট্যানারি শ্রমিকদের অনেকে বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। 
 
সরেজমিনে শিল্প নগরী ঘুরে দেখা যায়, এখানকার রাস্তাঘাট পুরোটাই ভাঙ্গা এবং খানাখন্দে ভর্তি। এর ওপর বিভিন্ন ট্যানারির ময়লা ও কেমিকেলযুক্ত পানি ড্রেন ভরে রাস্তায় উঠে তলিয়ে গেছে পুরো এলাকা। এসব পানির ওপর দিয়েই চলাচল করতে হয় শ্রমিকদের। ফলে খেয়ে না খেয়ে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন মৌসুমী শ্রমিকরা। 
 
ট্যানারি শ্রমিকরা জানান, ঈদের দিন বিকেল থেকে ট্যানারিতে চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করছেন। চামড়া প্রতি ২০-৫০ টাকা চুক্তিতে গাড়ি থেকে চামড়া নামিয়ে সেই চামড়ায় লবণ লাগানোই তাদের কাজ। তাদের মতো এমন আরও প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক প্রতিদিন এভাবে কাজ করছেন সাভার ট্যানারি শিল্প নগরীতে। 
 
ট্যানারি শ্রমিক শাহ আলম বলেন, এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত ময়লা এবং দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় কাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হয়। কেবল টাকার জন্য এ অসুবিধা মেনে নিচ্ছেন শ্রমিকেরা। কিন্তু অতিরিক্ত গরম, থাকা-খাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ট্যানারীতে নেই কোন প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র। ফলে তাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষদের টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
 
এর আগে বার বার ট্যানারি শ্রমিকরা শ্রম আইন অনুযায়ী স্বল্পমূল্যে ক্যান্টিন চালু, আবাসন সমস্যার সমাধান ও হাসপাতাল স্থাপন, শিল্প নগরীর রাস্তায় পর্যাপ্ত বাতি, রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা দূর করাসহ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে এলেও সে অনুযায়ী বিসিক কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি। 
 
মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, কোরবানীর ঈদে ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে নিজেদের পুঁজি এবং লগ্নিকৃত টাকা বিনিয়োগ করে চামড়া কিনে সেগুলো কাংক্ষিত মূল্যে বিক্রি করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি চামড়া ৭-৯ শত টাকায় ক্রয় করলেও বিক্রি করতে হচ্ছে পাঁচশ বা তারও কমে। 
 
চামড়া ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার প্রতি ফুট চামড়ার মুল্য ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও ট্যানারী মালিকরা সেই দামে চামড়া কিনতে চাইছে না। দুই পয়সা লাভের আশায় দূর দুরান্ত থেকে চামড়া কিনে বিক্রির জন্য ট্যানারিতে এনেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া বিক্রি হচ্ছে না জানিয়ে ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত মূল্য দিয়ে কোন চামড়া ক্রয় করবে না বলে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে। এছাড়া আড়ৎদারদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে ট্যানারি মালিকরা চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলায় চামড়া বিক্রির টাকায় গাড়ি ভাড়াও উঠবে না বলে জনান একাধিক চামড়া ব্যবসায়ী। 
 
এস.বি. শাহী ট্যানারীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শাহজাহান ভূইয়া সাজু চামড়া ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, একটি চামড়া সর্বোচ্চ ১২ ঘন্টা পর্যন্ত ভালো থাকে, এর পর থেকে পঁচতে শুরু করে। এ পঁচা চামড়া কোন ট্যানারি মালিকই কিনতে চাইবে না। কারন হিসেবে তিনি বলেন, পঁচা চামড়াগুলো কিনে ওয়েন্ট ব্লু করা হলে পরবর্তীতে সেগুলো ড্যামেজ হওয়ার আংশকা থাকে। তখন আমদের শ্রম এবং অর্থ দুটোই বিফলে যায়। 
 
ইত্তেফাক/নূহু