ডেঙ্গুর প্রকোপ ১১ জনের মৃত্যু

জলাবদ্ধতা, খোলা ড্রেন আর যত্রতত্র আবর্জনার স্তূপের কারণে রাজধানী হয়ে উঠেছে মশা প্রজননের অভয়ারণ্য। এতে বাড়ছে মশাবাহিত চিকনগুনিয়া ও ডেঙ্গু রোগ। অথচ মশা নিধনে বছর বছর বরাদ্দ বাড়াচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। গতবছর ঢাকাবাসীকে চিকুনগুনিয়া রোগ নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। আর এ বছর শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১১ রোগী মারা গেছেন। যারা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
 
বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বাসিন্দারা মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ বেশি। সেখানে রাস্তা-ঘাট, বাসা-বাড়ি, অফিস, পার্ক কিংবা খেলার মাঠ সব জায়গায় মশার উপদ্রব। মশার অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না বস্তি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকাগুলোও। বাদ যাচ্ছে না বিমানবন্দরও। মশার কারণে চলতি বছর বিমানের একটি ফ্লাইট দুই ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়েছে বলে জানা গেছে।
 
ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে মশা তাড়াতে সংস্থাটি খরচ করেছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরেও সংস্থাটি ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। মশা নিধনে ডিএনসিসির ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১৪ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। 
 
তবে দিন দিন বরাদ্দ বাড়লেও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। উপরন্তু বরাদ্দ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মশার উপদ্রব। তারা বলছেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর মশা প্রায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল থেকে শুরু করে চলন্ত গাড়িতেও কামড়াচ্ছে মশা। দিনের বেলায় উপদ্রব কিছুটা কম থাকলেও রাতের বেলায় অসহনীয় হয়ে ওঠে। মশারি, কয়েল কিংবা ইলেকট্রিক ব্যাট দিয়েও মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মশানাশক স্প্রে করেও মিলছে না প্রতিকার। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার জীবনচক্র নিয়ে না বোঝার কারণে যে কোনো পদক্ষেপই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ফলে রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
 
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান  ইত্তেফাককে বলেন, মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন এককভাবে কাজ করলে হবে না, পাশাপাশি নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। আমরা মশার ওষুধ ছিটাচ্ছি। একই সাথে জনসচেতনতামূলক যেসব কর্মকাণ্ড আছে, সেগুলোও চালাচ্ছি। মসজিদের ইমামের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোতে জনসচেতনতামূলক প্রোগাম করছি। কিন্তু মানুষের সচেতনতা যেভাবে বাড়ার কথা সেভাবে বাড়ছে না।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তর সিটির তেজগাঁও, মহাখালী, বাড্ডা, শেরেবাংলা নগর, মিরপুর, উত্তরা ও গাবতলী এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি। বস্তিগুলোতে মশার উপদ্রব আরো বেশি। অভিজাত বারিধারা, গুলশান ও বনানী এলাকার বেশিরভাগ ফ্ল্যাটে মশার অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে জানালা-দরজায় নেট লাগাতে দেখা গেছে।
 
সিটি করপোরেশনের দাবি, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য ৫ থেকে ৬ জন করে কর্মী নিযুক্ত আছেন। তারা দিনে দুইবার ওষুধ ছিটানোর কাজ করেন। তবে সিটি করপোরেশন এমন দাবি করলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ, মশক নিধনকারী কর্মীদের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে কালেভদ্রে দেখা মেলে।
 
উত্তর সিটির আওতাধীন শ্যামলী ২ নং রোডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম গত পাঁচদিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে ভুগছেন। তিনি জানান, পাঁচদিন আগে আমার জ্বর হয়। প্রথম দিকে ওষুধ খাওয়ার পর জ্বর না কমায় ডাক্তারের কাছে গেলে রক্ত পরীক্ষা করতে দেয়। শুক্রবার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ওই এলাকায় আরো কয়েকজন একইভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশনের কোন লোককে মশার ওষুধ দিতে দেখি না। তারা যদি মাঝে-মধ্যে ধোঁয়া দিত তা-ও তো আমরা খুশি হতাম। সেটাও দেখি না।’
 
ইত্তেফাক/নূহু