সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ছবিতে দেখা গেছে, গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ঘটনায় অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছেন ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি-শার্ট পরা তরুণীরা। বাক্যটি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি চলছে সমালোচনাও। কিন্তু গণপরিবহনে নারীদের প্রায়ই নানা হেনস্থার শিকার হতে হয়, সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনাই যার সত্যতা প্রমাণ করে। আর এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলেছি এ প্রজন্মের কয়েকজন তরুণ তরুণীর সঙ্গে। কী ভাবছেন তারা? তাদের ভাবনাগুলোই লিপিবদ্ধ করেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
শহিদুল ইসলাম কাজল
সমাজকর্মী ও বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা
‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ বাক্য সংবলিত ক্যাম্পেইনটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু আলোচনা-সমালোচনা চোখে পড়েছে। অনেকে সমর্থন দিলেও কেউ কেউ এটিকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন। সেই মানুষগুলো হয়তো ভাবছেন না, তাদেরই কারোর বোন, মা কিংবা স্ত্রী-ই প্রতিদিন গণপরিবহনে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। জনসচেতনতার অভাবই এক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময়কার সেই মিনা কার্টুনের কথা ভাবুন। মিনার মাধ্যমে একসময় গ্রাম থেকে শুরু করে সারাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়েছে। যেমন :কিভাবে হাত ধুতে হবে, প্রতিদিন কী কী খাবার খেতে হবে, রোগবালাই থেকে সুস্থ থাকতে কী করতে হবে ইত্যাদি। এমনকি বাল্যবিবাহ, যৌতুকের মতো বিষয়গুলোও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে। আমার মতে, গণপরিবহন বা প্রতিদিনের কর্মক্ষেত্রে নারীরাও যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন, সেজন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। এমন মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যেন প্রতিটি নারীকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। কোনো নারীকে হেয় করা বা হয়রানি করা যে একটি নেতিবাচক ও ঘৃণ্য কাজ, সেটি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে, যেন এই প্রজন্ম সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হয়।
মুন্নী আক্তার
গণমাধ্যমকর্মী
স্বপ্ন দেখায় ছেলেমেয়ের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখে মানুষ। আট-দশটা ছেলের মতো মেয়েরাও প্রতিদিন একটা নতুন স্বপ্নকে বুকে নিয়ে সংগ্রামময় জীবনের দিকে ধাবিত হয়। স্বপ্ন থাকে বিশ্বজয়ের, অন্যের নির্ভরশীল না হয়ে নিজের পায়ে ভর করে আপন পৃথিবীকে দু চোখ ভরে দেখার। তবে, প্রায়শই সেই স্বপ্নদেখা কিংবা স্বপ্নপূরণের পথটা ছেলেদের মতো সহজ হয় না, কারণ চলার পথের নানা বাধাবিপত্তির কারণে সেই উত্সাহে ভাটা পড়ে। একজন নারী সকালে যখন নতুন একটা স্বপ্ন পূরণের উদ্যম নিয়ে বের হন, সেই উদ্যমের মৃত্যু হয় রাস্তায়, গণপরিবহনে। কিছু মানুষরূপী, অথচ বোধহীন লোকেদের তীর্যক চাহনি, অশ্লীল ভঙ্গি বা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অনেক নারী। হয়তো সেই চাহনি দেখে নিজের শরীরকে ঘৃণা করার ইচ্ছে জাগে। আর গণপরিবহনে সুযোগ পেলেই কাছে এসে দাঁড়িয়ে মেয়েদের শরীরকে স্পর্শের চেষ্টা করে কিছু বিকৃতমস্তিষ্কের মানুষ। হয়তো বলে শেষ করা যাবে না, শুধু এই অমানুষগুলোর কামনার চাহনির কাছে কত নতুন স্বপ্ন ও সম্ভবনার মৃত্যু হচ্ছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা বদলাতে হবে, নারীদের হেনস্থার প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে।
ইফতেখার ফাগুন
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী
বাংলাদেশে ৯৪ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে গণপরিবহণে হেনস্থার শিকার হন। সংখ্যাটা বিশাল। আর এটা প্রতিনিয়ত হয়ে আসছে নারীদের সঙ্গে। ইদানীং আরো বেশি আলোচনায় এসেছে টি-শার্টে লেখা বাক্যগুলোর কারণে। বাংলাদেশ যেখানে উন্নয়নশীল অবস্থা থেকে উন্নত দেশ হতে সংগ্রাম করছে, সেখানে নারীরা বড় ধরনের ভূমিকা রাখছেন। গার্মেন্টস, কলকারখানা, অফিস আদালত—সব জায়গায় পুরুষের পাশাপাশি তাদের সমান ভূমিকা রাখতে হচ্ছে। আর প্রতিদিন চলাচলে ব্যাবহার করতে হচ্ছে গণপরিবহণ, তাতেই হেনস্থার শিকার হচ্ছেন তারা। যে ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটছে, তার সবগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে পারছি না। শুধু রাজধানীতেই নয়, সারা দেশে এমন ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি দেশের ভবিষ্যত্ নির্ভর করে তরুণ প্রজন্মের ওপর। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম গণপরিবহণে নারীদের নিপীড়নের সমস্যাকে রুখে দাঁড়াতে চায়। গণপরিবহণে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তন। সেক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সর্বস্তরে কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর তরুণদেরই উদ্যোগ নিতে হবে এই সমস্যা সমাধানে সোচ্চার হওয়ায়।
উম্মে হাবিবা আক্তার রিমু
চাকরিজীবী
ঘরের বাইরে নানা প্রয়োজনেই নারীদের পা রাখতে হয়। তাছাড়া বিগত বছরগুলোয় কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের পদচারণা বেড়েছে বহুগুণ। আর নিজের গন্তব্যে পৌঁছার জন্য সবারই প্রথম পছন্দ গণপরিবহন। কিন্তু গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা লক্ষণীয়ভাবেই কমছে। কখনো বাসের সহযাত্রী, কখনো বাসের হেল্পার বা ড্রাইভারের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে নারীরা। আশঙ্কাজনক হারে এই হয়রানি বেড়েই চলছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়রানির শিকার হয়েও চুপ থাকছেন নারীরা। আর যারা প্রতিবাদ করছেন, তাদের অধিকাংশকেই চুপ হয়ে যেতে হচ্ছে অপরাপর সহযাত্রীদের নির্লিপ্ততার কারণে! কর্মজীবী নারী ও নারী শিক্ষার্থীদেরই এই ভোগান্তি বেশি পোহাতে হয়। তবে এত আঁধারের মাঝেও আশার আলো এই যে, যৌন হয়রানির ব্যাপারে এই প্রজন্ম বেশ সচেতন এবং সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি টি-শার্টে লেখা ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’-এর মাধ্যমে অনেকেই গণপরিবহনে হওয়া এই যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এবং এই টি-শার্টের উদ্যোক্তাও এই প্রজন্মের তরুণদেরই একজন। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আমাদের মা-বোনেরা কেউই নিরাপদে থাকবেন না রাস্তায়। আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিজের পাশাপাশি অন্যকেও সচেতন করতে হবে, গড়ে তুলতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মানসিকতা।
প্রান্তিক চৌধুরী অর্ঘ্য
সংগঠক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন নারীদের হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর দেখি, তখন থমকে যাই। মনে পড়ে, ছোটবেলা থেকে দেখেছি আমার শিক্ষিকা মাও বাসে করে স্কুলে যেতেন। আমার বোনও বাসে চলাচল করে। গণপরিবহনে যে হেনস্থার চিত্র আমরা শুনতে পাই, সেটি আমার মা-বোনের ক্ষেত্রেও হয়েছে কি না, তেমনটা ভাবলে শিউরে উঠি। ঘৃণা হয়। উন্নতির পথে অনেক দ্রুত এগোচ্ছি আমরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে ও কর্মক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তা সত্ত্বেও প্রায়ই তাদের নানাভাবে হেনস্থায় পড়তে হয়। অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। কিছু মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষই এসবের মূল হোতা। তবে আশার কথা হলো, প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। নারীরা হয়রানির শিকার হলে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাহস জোগাতে হবে। আর কাউকে প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে দেখলে তার সঙ্গেও গলা মেলাতে হবে। তবেই আমরা নিশ্চিত করতে পারব সুন্দর কর্মপরিবেশ, নিরাপদ গণপরিবহন।
জুবায়ের আহম্মেদ
শিক্ষার্থী
দিন দিন গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রেও অনেক সময় মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। পত্রিকার পাতায় আমরা গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার খবর দেখতে পাই। বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে গণপরিবহনে নারীর সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নিচে। আর মেয়েরাও এখন এসব হয়রানি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ফেসবুকে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ টি-শার্টের ছবি ভাইরাল হয়। তরুণীরা এর মাধ্যমে নিজেরাই প্রতিবাদ জানাচ্ছে, সচেতনতা সৃষ্টি করছে সকলের মাঝে। কর্মক্ষেত্রেও মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। তাই মেয়েদের নিরাপত্তা সুরক্ষায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে ব্যক্তি ও সংঘকে। অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। শেষে একটা ঘটনা বলি, কয়েকদিন আগে শাহবাগ থেকে মিরপুরে আসার বাসে উঠি। আমি পেছনের সিটে বসে ছিলাম। তখন এক আপুও বাসে ওঠেন। কিন্তু কোনো সিট খালি নেই। সামনে থেকে এক ভদ্রলোক নিজের সিট থেকে দাঁড়িয়ে আপুটিকে বসতে দিলেন। ভদ্রলোকটি আগারগাঁও পর্যন্ত দাঁড়িয়ে এলেন। আমাদের মানসিকতার যদি পরিবর্তন হয় তাহলে গণপরিবহন কিংবা কর্মক্ষেত্র—উভয় স্থানেই মেয়েরা নিরাপত্তা পাবে। আর মেয়েদের নিরাপদ রাখার দায়িত্ব সকলের। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।