বাবার স্বপ্নপূরণ করতে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে চাষের মাঠে তরুণী

 

>> বুলবুল ফাহিম

 

শিক্ষাজীবনে অনেকের অনেক ধরনের স্বপ্ন থাকে। কেউ হতে চান ডাক্তার আবার কেউ ইঞ্জিনিয়ার। কারো মনে থাকে সরকারি বড় কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সবার তো আর স্বপ্ন পূরণ হয় না। আবার কারো কারো স্বপ্ন পূরণ হলেও আবার পারিবারিক কারণে তা বিসর্জন দিতে হয়। এমনই একজন হলেন জ্যোত্স্না ডোন্ডে। বাবার স্বপ্নপূরণ করতে ইঞ্জিনিয়ারিং বাদ দিয়ে এখন বাবার মতোই চাষাবাদ করছেন তিনি! ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়লেও চাষাবাদেও ব্যাপক সফল হয়েছেন জ্যোত্স্না।

ভারতের মাহারাষ্ট্রের নাসিকের বাসিন্দা জ্যোত্স্না। ছোট থেকেই জ্যোত্স্না ছিলেন দারুণ মেধাবী ছাত্রী। মেয়ে পড়াশোনা করে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবেন। বাবা-মায়েরও সেই ইচ্ছাই ছিল। কিন্তু জ্যোত্স্নার ভাগ্যে সেটা ছিল না। তাই চাকরি পেয়েও তাকে ছেড়ে দিতে হয় সেই চাকরি।

ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, জ্যোত্স্নার বয়স যখন ৬ বছর, তখন তার বাবার একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে। অকেজো হয়ে যায় পা। এরপর তিনি আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারতেন না। চিকিত্সার খরচ চালানোর জন্য মা আঙুর চাষ শুরু করলেন। মায়ের হাত ধরে সেই প্রথম আঙুর চাষের সঙ্গে পরিচয় হয় জ্যোত্স্নার।

মায়ের হাত ধরে প্রতিদিন দুই বেলা জমিতে যেতে শুরু করেন তিনি। স্কুলের বাইরে এই চাষের জমিই যেন তার আপনা হয়ে উঠতে থাকে। স্কুলে যাওয়ার আগে, স্কুল থেকে ফিরে চাষের কাজ করার ফাঁকে জমিতে বসেই পড়াশোনা চালাতেন।

২০০৫ সালে বাবা অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। হাঁটাচলাও করতে শুরু করেন। চাষের কাজ ছেড়ে জ্যোত্স্না পড়াশোনায় মন দেন। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে পড়াশোনা করে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের লক্ষ্যে এগোতে থাকেন। ভালো রেজাল্টের ফলে চাকরিও পান। কিন্তু ভাগ্যের হাতছানিতে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি তিনি।

এরপর এক বছর নাসিকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আঙুর গাছের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। গাছ বাঁচাতে আঙুরের জন্য সার কিনতে গিয়ে ফের দুর্ঘটনায় পড়েন জ্যোত্স্নার বাবা। পা পিছলে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে সারা জীবনের জন্য পা অকেজো হয়ে যায় তার।

জ্যোত্স্না তখন একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। অকেজো পা নিয়ে বিছানায় শুয়েও ক্রমাগত আঙুর চাষের দুশ্চিন্তাই লেগে থাকত বাবার মনে। চাষ-আবাদের প্রতি তার তীব্র ভালোবাসার কাছে হার মানল মেয়ের ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন।

২০১৭ সালে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে এলেন জ্যোত্স্না। দিনরাত এক করে মন দিয়ে চাষাবাদ শুরু করলেন। শয্যাশায়ী বাবার মুখে শুনে ট্রাক্টর চালানোও শিখে ফেলেন। যেখানে গাছের একটি শাখায় ১৫ থেকে ১৭টা আঙুর ফলত, বর্তমানে সেখানে ২৫ থেকে ৩০টি আঙুর ফলেছে। ফলে আয়ও দ্বিগুণ হয়েছে।

২০১৮ সালে ‘কৃষিথন বেস্ট ওম্যান ফার্মার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন জ্যোত্স্না। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েও বাবার মুখে হাসি ফুটিয়েছেন তিনি, পেয়েছেন স্বীকৃতিও।