গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি দোতলা বিল্ডিংয়ে তিতাস গ্যাস সংযোগে বিস্ফোরণের ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত হইয়াছেন, আহত হইয়াছেন আরো কয়েকজন। হাই-প্রেসার পাইপলাইন হইতে নেওয়া অবৈধ সংযোগের কারণেই ঘটনাটি ঘটিয়াছে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। জানা যায়, বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত বাড়িটির মালিক তাহার দুই তলা ভবনে তিতাস গ্যাসের হাই-প্রেসার পাইপলাইন হইতে অবৈধভাবে গ্যাসের সংযোগটি নিয়াছিলেন। বাড়িটি তিনি স্থানীয় পোশাক শ্রমিকদের কাছে ভাড়াও দিয়াছেন। শবেবরাতের কারণে সমস্ত মিল-কারখানা বন্ধ থাকায় গ্যাসের প্রেসার ছিল অধিক। রাত তিনটার দিকে হঠাত্ বিস্ফোরণে বিল্ডিংয়ের পুরা দেওয়াল ভাঙিয়া প্রায় ৫০ হইতে ৩০০ ফুট দূরে গিয়া পড়ে। গুরুতর দগ্ধ ছয়জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তন্মধ্যে তিনজন মারা যান। গত বত্সর অনুরূপ বিস্ফোরণে মৃতের সংখ্যা ছিল শতাধিক এবং আহত হইয়াছিল কয়েকশত মানুষ। তিতাসের নিজস্ব প্রতিবেদনমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবত্সরে তিতাসের বিতরণ এলাকায় ৫ হাজার ৮৮৮টি দুর্ঘটনা ঘটে। তন্মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ২৩৮টি। গ্যাস পাইপলাইনে লিকেজের ঘটনা ৫ হাজার ৬৫০টি। ইতোমধ্যে পুলিশ বাড়ির মালিককে আটক করিয়াছে। তবে তিনি বলিয়াছেন যে, অন্যরা যেইভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়াছে তিনিও সেইভাবেই নিয়াছেন। অবৈধ সংযোগই যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। গত বত্সর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বৈধকরণ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করিবার দাবিতে তিতাস গ্যাস অফিস ঘেরাও এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পর্যন্ত পালন করিয়াছিল অবৈধ সংযোগ গ্রহীতারা।

সংকটের কারণে বৈধ গ্রাহকরাই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাইতেছেন না। শিল্পসহ বাসাবাড়িতেও গ্যাসের জন্য দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের; কিন্তু অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়াই চলিয়াছে। শুধু আবাসিক নহে, কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ছোট কমপ্রেসার বসাইয়া অবৈধভাবে গ্যাস টানিয়া নিতেছে। সিএনজি স্টেশনগুলি যানবাহন ছাড়াও অনুমোদনহীনভাবে সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রয় করিতেছে। এইসব ঘটিতেছে তিতাসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে। ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলিতে গ্যাসের অবৈধ পাইপলাইন পাঁচ শত কিলোমিটারের মতো। আর এসকল লাইন হইতে অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করিতেছেন কম-বেশি আড়াই লক্ষ গ্রাহক। গ্যাস বিতরণে নিয়োজিত তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি অনুসন্ধান চালাইয়া এই বিপুল অবৈধ পাইপলাইনের অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাইয়াছে। যেইখানেই গ্যাসের পাইপলাইন সেইখানেই ছড়াইয়া-ছিটাইয়া আছে অবৈধ সংযোগ। প্রতিদিন অবৈধভাবে ব্যবহূত হইতেছে ২২ লক্ষ ঘনফুট গ্যাস। শুধু অবৈধ গ্যাস সংযোগ নহে, গোপনে অনেক অবৈধ বিতরণ লাইনও বসানো হইয়াছে।

গ্যাসের মতো অপরিহার্য জ্বালানির মওজুদ আমাদের একেবারেই সীমিত। সংকটের কারণে ইতোমধ্যে ডজনখানেক বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ হইয়া গিয়াছে। পূর্ণাঙ্গ উত্পাদন ক্ষমতা থাকিলেও প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হইতেছে না। একই কারণে আবেদন করিয়াও সংযোগ পাইতেছে না  এক হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান। শিল্প ও গৃহস্থালি চাহিদা মিটাইতে সরকার এলএনজি আমদানি করিতেছে। অথচ এই পরিস্থিতিতেও একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম-দুর্নীতি থামিতেছে না। আর অপরিকল্পিত, অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং পুরাতন গ্যাসলাইনের কারণে প্রতিনিয়তই রাজধানীতে ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। পুলিশ যদিও বিস্ফোরণের শিকার বাড়িটির মালিককে গ্রেফতার করিয়াছে; অবৈধ সংযোগদানের জন্য দায়ী লাইনম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থলোলুপ অসাধু কর্মীদের কারণে কেবল যে দুর্ঘটনা-প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হইতেছে তাহাই নহে, একইসঙ্গে সরকারও বড়ো ধরনের রাজস্ব হারাইতেছে। আমরা মনে করি, দায়ী চক্রটিকে শাস্তির আওতায় আনিতে পারিলে পরিস্থিতির উন্নতি হইবে।