ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ এখন শক্তিধর অনেক দেশেরই মাথাব্যথার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নিজেদের নিকট ইহার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকিলে দুই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ অন্যদেশের হাতে থাকিবার দরুন ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধ চলিলে ইন্টারনেট হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইবার ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়ত, নিজদেশের মানুষের কার্যকলাপের সম্পূর্ণ নজরদারি চালানো যায় না। এই আশঙ্কা অবশ্যই উচ্চস্তরের; কিন্তু যেই সকল বড়ো দেশ সকল কিছুই নিজেদের কর্তৃত্বে রাখিতে চাহে, তাহাদের নিকট এই আশঙ্কা গুরুতর বটে। সেই কারণে আমরা দেখিতে পাইতেছি, রাশিয়া নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু করিতে চাহিতেছে।
রাশিয়া হইতে বহির্বিশ্বে সাইবার হামলা এবং অনলাইনে বিভিন্নভাবে অবৈধ হস্তক্ষেপ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কথা আমরা প্রায়শই শুনিয়া থাকি। এমনকী যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিযোগ শোনা গিয়াছে। এই সকল বিবিধ কারণে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়া আসিতেছে ন্যাটো ও তাহাদের মিত্ররা। এমতাবস্থায় রাশিয়া মনে করিতেছে, বিদেশি শক্তিগুলি কখনো যদি রাশিয়াকে ইন্টারনেট হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিবার উদ্যোগ লয়, সেই পরিস্থিতিতেও রুশ আইএসপিগুলি কী করিয়া সচল রাখিবে রাশিয়া? উল্লেখ থাকে যে, বর্তমানে যেই ১২টি প্রতিষ্ঠান ডিএনএসের রুট সার্ভার দেখভাল করিয়া থাকে, তাহার কোনোটিই রাশিয়ার নহে। এই কারণে সম্প্রতি রাশিয়া সম্পূর্ণ দেশীয় ইন্টারনেট সংস্করণ চালুর উদ্যোগ লইয়াছে, যাহার নাম রাশিয়ান ইন্টারনেট বা রুনেট। সম্প্রতি রুনেটের প্রস্তাবটি ডুমায় পাস হইয়াছে বিপুল ভোটে। অতি শীঘ্রই পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ফেডারেশন কাউন্সিলে ইহা পাস হইবার পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বাক্ষর করিলেই ইহা আইনে পরিণত হইবে। গুঞ্জন রহিয়াছে যে, এই বত্সরের পহেলা নভেম্বর হইতেই রুনেটের কাজ শুরু করিতে চাহে রাশিয়া।
রাশিয়ায় ইন্টারনেটে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হইয়াই রহিয়াছে। ২০১৬ সালের এক আইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিকে ব্যবহারকারীদের তথ্য রাশিয়ার অভ্যন্তরে স্থাপন করা সার্ভারে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। এইবার রুনেটের মাধ্যমে রাশিয়ায় সরকারবিরোধী অনলাইন প্লাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হইবে বলিয়া মনে করিতেছেন বিশ্লেষকরা। সুতরাং রুনেটের মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি মারিতে যাইতেছে রাশিয়া। প্রথমত, নিজের দেশের ইন্টারনেটের কর্তৃত্বের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সহিতও ডিএনএস-এর রুট সার্ভারের মাধ্যমে সাধারণভাবে সংযুক্ত থাকিতে পারিবে। কারণ, ডিএনএস-এর রুট সার্ভারের মূল অ্যাড্রেসবুকের অনেকগুলি কপি রাখিয়াছে রাশিয়া। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তথ্য যতটা সম্ভব রাশিয়ার মধ্যেই রাখা সম্ভব হইবে।
ইহা হইতে যাইতেছে এমন একটি কাচের দরজার মতো, যাহার পর্যবেক্ষণের পাশ দিয়া অপরপক্ষের সকল কিছুই দেখা যাইবে; কিন্তু অপরপক্ষ তেমন কিছুই দেখিতে পারিবে না। ইহা পরাশক্তিদের স্ব নিয়ন্ত্রণের নূতন প্রচেষ্টা বলিয়া মনে হইতেছে।