গাইবান্ধা বিআরটিএ অফিস এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর দালালদের আঁখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র ও ফিটনেস পরীক্ষাসহ প্রায় সকল কাজই করতে এসে হয়রানির পাশাপাশি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ অফিসে দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না।
সেবাপ্রত্যাশীদের (মোটরযান মালিক বা চালক) অভিযোগ, হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে দালালদের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকে না। আর দালালরা অফিস খরচের নাম করে ফাইল প্রতি অতিরিক্ত দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিটি যানবাহনের ফিটনেসের জন্য অতিরিক্ত পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। যদি যানবাহনের কাগজপত্র ঠিক না থাকে, তাহলে চুক্তির মাধ্যমে কাগজ তৈরি করে ফিটনেস দেয়া হয়। সেবাপ্রত্যাশীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, গত জানুয়ারি মাসে এই অফিসের মোটরযান পরির্দশক মোঃ রুহুল আমিন অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত হিসাবে এই দায়িত্ব পান মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট মোঃ জয়নাল আবেদিন। তারপর থেকে এই অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দালাল জানায়, অতিরিক্ত টাকার একটা অংশ প্রতিমাসে ভাগবাটোয়ারা হয় অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার মাঝে। ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় শতভাগ পাসের গ্যারান্টি দিয়েই টাকা হাতিয়ে নেয় দালাল চক্রের সদস্যরা। আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করলে মাসের পর মাস ঘুরেও সমস্যার সমাধান হয় না।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের ভুট্টু মিয়া অভিযোগ করেন, মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য এখানকার জনৈক এক দালালকে তিনি অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু প্রায় তিনি মাস কেটে গেলেও তিনি এখনও লাইসেন্স হাতে পাননি। এখন সেই দালাল বলছে, আরো অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা দিতে হবে। তিনি বলেন, অফিসে গেলে বোঝা যায় না, কে দালাল বা আর কে অফিসের লোক।
সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের মধ্যপাড়ার মাহমুদুল হক জানান, মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে দালালের সহায়তা না নেওয়ায় তাকে একাধিকবার হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। প্রাথমিক কাজ ও যাচাই-বাচাই শেষে এ্যাসেসমেন্ট স্লিপ নিয়ে ফি প্রদানের পর মোটরসাইকেলটি পরিদর্শনের জন্য বিআরটিএ অফিসে হাজির করা হলে সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ স্টাফরা জানান, তার চেচিস নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বর ভুল হয়েছে। এই ভুল সংশোধন করতে আবারো তাকে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়। এরপর সব কাজ শেষে তারা আবার জানান, মোটরসাইকেলের নাম ভুল হয়েছে। আবারো ৮০০ টাকা জমা না দিলে এই ভুল সংশোধন করা যাবে না। অথচ আমি নিজে গাড়ির চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর এবং মোটরসাইকেলের নাম আবেদনে সঠিকভাবে লিখে দিয়েছি। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা কিংবা দালালের শরণাপন্ন না হওয়ায় তারা বারবার ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে হয়রানি করেন। একই উপজেলার দামোদরপুর এলাকা থেকে এই অফিসে আসা জাহাঙ্গীর আলম নামে আর এক ব্যক্তি জানান, মোটরসাইকেল মালিকানা বদলি করতে এখন সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেয়ার পর অতিরিক্ত এক থেকে দুই হাজার টাকা দেয়া না হলে বিভিন্ন অজুহাতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ডোমেরহাট এলাকার আতিকুর রহমান জানান, মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নির্দিষ্ট ফরম (আবেদনপত্র) পূরণ করে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয়। পরে ফরমের সঙ্গে টাকা জমা দেওয়ার রশিদ, ন্যাশনাল আইডি কার্ড, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কাগজপত্র ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জমা দিতে হয়। কিন্তু তারপরও দালালের শরণাপন্ন হয়ে অতিরিক্ত টাকা না দিলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও মেলে না শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অফিসের এক কর্মচারী জানান, অফিসের জনবল সংখ্যা ৫ জন। তারমধ্যে অফিস প্রধানের পদ ‘সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন)’ পদটি দীর্ঘদিন থেকে শূন্য। রংপুর অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) আব্দুল কুদ্দুস অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে প্রতি সপ্তাহে মাত্র একদিন বৃহস্পতিবার গাইবান্ধায় অফিস করেন। অনেক সময় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় দুই-তিন সপ্তাহ পর অফিসে আসেন। তার স্বাক্ষর ছাড়া কোনো কাগজপত্র ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হয় না। একারণে সেবাপ্রত্যাশীরা মাঝে মধ্যে হয়রানির শিকার হন।
তিনি আরো জানান, চলতি মাসের গত ৩ সেপ্টম্বর আমিনুল ইসলাম নামে নতুন এক কর্মকর্তা মোটরযান পরির্দশক পদে যোগদান করেছেন। তাই মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট মোঃ জয়নাল আবেদিনের পরিবর্তে আমিনুল ইসলাম এখন বিষয়গুলো দেখবেন। কিন্তু বায়োমেট্রিক গ্রহণের জন্য ব্যবহূত বিকল কম্পিউটারটি ভালো করার জন্য তিনি ঢাকায় যাওয়ায় এখনও নিয়মিত অফিস করা শুরু করেননি।
এ ব্যাপারে বিআরটিএ অফিসের মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট মোঃ জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, অফিসে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব রয়েছে। কাজের চাপও বেশি। সেকারণে দীর্ঘদিন থেকে অতিরিক্ত ৪/৫ জন লোক আমাদের সহায়তা করে আসছেন। এছাড়া গাইবান্ধা সার্কেল এর স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য ও ছবি গ্রহণের কম্পিউটারটি বিকল হওয়ায় মেরামতের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ কারণে স্মার্টকার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের (ডিআরসি) ফিঙ্গার প্রিন্ট গ্রহণের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মেরামতকৃত/নতুন কম্পিউটার প্রাপ্তি সাপেক্ষে পুনরায় ফিঙ্গার প্রিন্ট গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করা হবে। এজন্য সেবাপ্রত্যাশীরা কিছুটা হররানির শিকার হচ্ছেন।
ইত্তেফাক/নূহু