ক্যাসেট বা সিডিতে গান শোনা এখন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না

 ই ম রু ল  নূ র

 

নব্বই দশকে ক্যাসেটে গান শোনার জোয়ার ছিল। দেশীয় সংগীত ইতিহাসে তখন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল এই মাধ্যমটি। ব্যবসায়িক সাফল্যের দিকে থেকেও সর্বোচ্চ অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল সংগীত জগত্। এখন যেমন সংগীতাঙ্গনে এসেছে বিরাট পরিবর্তন, তেমনি গান শোনার মাধ্যমেও ঘটেছে বিবর্তন। অনেকেই যেটাকে বলছেন ‘ডিজিটাল গানের যুগ’। 

নব্বই দশকে ফিতার ক্যাসেটে গানের অ্যালবাম প্রকাশের যুগটা শ্রোতাদের মনে এক অন্যরকম দাগ কেটে আছে। যুগের পরিবর্তনে ক্যাসেট প্লেয়ারের পরে এলো সিডি প্লেয়ারের যুগ। কালের গর্ভে হারিয়ে যায় ক্যাসেট। বছর কয়েক চলার পর সেই সিডি প্লেয়ারের যুগটাও জায়গা করে নিল ইতিহাসের পাতায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু হলো অনলাইনে গানের প্রকাশনা।

বর্তমানে ক্যাসেট বা সিডিকে ছাড়িয়ে এক বিশাল জায়গা করে নিয়েছে অনলাইন। এই যুগে আর ফিতা কিংবা সিডিতে গান প্রকাশিত হয় না, হয় অনলাইনে। ইউটিউব, ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুকের মাধ্যমে শ্রোতারা যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে খুব সহজেই উপভোগ করতে পারছেন সেইসব গান। সেইসঙ্গে মুঠোফোনের অ্যাপ্লিকেশনের কারণে আরো বদলে যাচ্ছে শ্রোতাদের গান শোনার অভ্যাস। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের জিপি মিউজিক, রবির ইয়ন্ডার মিউজিক, বাংলালিংকের বিএল ভাইবের কথা বেশি উল্লেখ করেন শ্রোতারা।

সেই দশকে রাজধানীর শাহবাগ, পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলি ও পল্টনে ছিল ক্যাসেটের পাইকারি দোকান। প্রায় সব বাড়িতেই ক্যাসেটের দেখা মিলত কিন্তু এখন তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তখন নতুন কোনো অ্যালবাম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাসেট বা সিডির দোকানে জমে যেত শ্রোতাদের ভিড়। দোকানগুলোয় চড়া ভলিউমে গান বাজাত। কিন্তু এখন তো আর সেই যুগ নেই, নেই অনেক দোকান, আর সেসব ক্রেতার তো দেখা নেই-ই। যেখানে আগে প্রতিদিন দুইশ থেকে আড়াইশ ক্যাসেট বা সিডি বিক্রি হতো, এখন তা নেই বললেই চলে।

সেসময় সংগীত তারকা তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিত্, আইয়ুব বাচ্চু, নকিব খান, জেমস, হাসান, খালিদ, শাফিন আহমেদ, বিপ্লব, বেবী নাজনীন, রবি চৌধুরী, মনির খান, কনক চাঁপা, রিজিয়া পারভীনসহ অনেকের গানে উন্মাতাল ছিল তারুণ্য। সোলস, চাইম, অবসকিওর, এলআরবি, মাইলস, নগর বাউল, রেনেসাঁ, আর্ক, প্রমিথিউস প্রভৃতি ব্যান্ডের গান ও আধুনিক গানের অ্যালবামগুলো লাখ লাখ কপি বিক্রি হতো।

শূন্য দশকের শুরুতে সাউন্ডটেক থেকে ক্যাসেটে মুক্তি পাওয়া আসিফ আকবরের ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ অ্যালবামটির ৬০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল। অথচ সেই ক্যাসেট এখন বিলুপ্ত। এরপর ২০০৩ কি ২০০৪ সালের দিকে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে সিডি ক্যাসেট। এ প্রজন্মের অনেকেই জানেন না সেই ক্যাসেটের যুগ সম্পর্কে। ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাওয়া সিডি, ডিভিডির সেই সময়কালে হারিয়ে যায় ক্যাসেট। তখন অডিও কোম্পানিগুলো সিডির মাধ্যমে গান প্রকাশ করতে শুরু করে। আর এরপরই পাইরেসির শিকার হয় কোম্পানিগুলো। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফ্রি ডাউনলোড করার ফলে ধ্বংসের মুখে পড়ে অডিও তথা সংগীত ইন্ডাস্ট্রি।

ফেসবুক, ইউটিউবের যুগে কেউ আর আগের মাধ্যমে গান শুনতে বা উপভোগ করতে চায় না। এই যুগে আর সেইসময়ের চাহিদা নেই। প্রযুক্তির প্রভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে প্রায় ৬৩০টিরও বেশি ক্যাসেট, সিডির দোকান। অডিও ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা এখন সর্বোচ্চ দুই সীমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন সংগীতবোদ্ধারা। একদিকে পাইরেসি, ফ্রি ডাউনলোড, প্রযুক্তির প্রভাব; অন্যদিকে সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে অডিও কোম্পানিগুলোর দূরত্বের কারণে অডিও ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা এখন নাজেহাল। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা তো আছেই। সব মিলিয়ে ক্যাসেট বা সিডিতে গান শোনা এখন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে গান ডাউনলোড করতে পারছে শ্রোতারা। যেখানে বিনামূল্যে গান পাচ্ছে, সেখানে টাকা দিয়ে সিডি কেনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।  

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে অডিও কোম্পানিগুলো। ক্যাসেট বা সিডি নিয়ন্ত্রণটা নেই কোম্পানির হাতে, যার ফলে তারাও কাজ করছে থার্ড পার্টির মাধ্যমে। তারা তাদের কোম্পানি থেকে সরাসরি গুগলের সঙ্গে, মোবাইল কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছেন। তাদের মূল আয় হয় এসব ডিজিটাল মাধ্যম থেকেই।

২০০৮ সাল থেকেই ধস নামল সিডির। আগে একটা সিডির ২০/৩০ হাজার কপি করা হলেও এখন ২০০ কপি করলেও সেটা চালানো মুশকিল হয়ে যায়। এখন যা সিডি করা হয়, তা শুধু প্রদর্শন আর প্রকাশনা উত্সবে দেখানোর সৌজন্যতায়।

তবে মাঝখানে বাজারে যে ধস নেমেছিল ডিজিটাল মাধ্যমকে ভর করে, সে অবস্থা এখন কোম্পানিগুলো কাটিয়ে উঠেছে। আগে বার্ষিক ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বেচাকেনা হতো। বছর পাঁচেক আগে এটা নেমে এসেছিল শূন্যে। কিন্তু এখন গুগল ও অ্যাপস থেকে ভালোই টাকা পাচ্ছে কোম্পানিগুলো। ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার যুগ শেষ হয়েছিল সিডি আসার পর। আর এখন গান দিন দিন হয়ে উঠছে অনলাইন কেন্দ্রিক। শিল্পীরা এখন সিডি বের করেন সংগ্রহে রাখার জন্য না হয় সৌজন্য কপি দেওয়ার জন্য; বিক্রির জন্য নয়।

অনেক অডিও কোম্পানিই গুটিয়ে নিয়েছে নিজেদের। আবার যারা টিকে আছে, তারা এখন টেলিকম কোম্পানিগুলোর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কিংবা অনলাইনের যেকোনো মাধ্যমে গান বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে একটা গান প্রতিবার ডাউনলোড করলে টাকা পাচ্ছে মিউজিক কোম্পানিগুলো। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির কালো অধ্যায় পার করে মিউজিক কোম্পানিগুলো নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে এখন ডিজিটাল মাধ্যমে এসেছে।

অনলাইনে গান তোলার জন্য এখন কনটেন্ট প্রভাইডাররাও মাঠে নেমে গেছেন। কাইনেটিক মিউজিক এমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যারা বিভিন্ন শিল্পীদের গান অনলাইনে তোলার কাজটি করছেন। জনপ্রিয় ও নতুন—দুই কাতারের শিল্পীরাই তাদের মাধ্যমে অনলাইনে গান ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু আগে ক্যসেট বা সিডি বিক্রির মাধ্যমে শিল্পীরা সেখান থেকে টাকা পেত, কিন্তু এই যুগে অনলাইন মাধ্যমে গান প্রকাশ করার পর গান প্রতিবার ডাউনলোড করলে টাকা পায় কোম্পানিরা। এখানে শিল্পীর কোনো লাভ নেই। শিল্পী কিছু পায় না। শিল্পীরা দুস্থ শিল্পীর খাতায় নাম লেখাচ্ছে। যারা যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তারাই লাভ করছে।