সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনেক এগিয়ে গেছে ইন্দোনেশিয়া

ঠিক কবে জন্মেছিলেন, সে বিষয়ে ইমাস সন্দিহান। তার ধারণা, ৩৫ বছর বয়স্কা। তবে জন্মসনদ না থাকায় এটি প্রমাণ করা অসম্ভব। এমনকি তার নামের ব্যাপারেও অনেকে আপত্তি তুলত, যেহেতু ইমাসের কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। ইন্দোনেশিয়ার অনেক নাগরিকের মতো ইমাসেরও একটিই নাম। দু’বছর আগে বাড়ির পাশের একটি নির্মাণ সাইটে বোমা বিস্ফোরিত হওয়ায় আগুন লেগে গিয়েছিল তার বাড়িতেই। এতে পুড়ে যায় মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র। সব মানদণ্ডেই ইমাস গরিব ছিলেন। কিন্তু কাগজপত্রের অভাবে সরকার প্রদত্ত সাহায্য-সহযোগিতা থেকে তিনি ছিলেন বঞ্চিত। তার পাঁচ সন্তানের একটি রাস্তায় গান গেয়ে দিনে ৫০ হাজার রুপিয়াহ’র (চার মার্কিন ডলার) মতো কামাই করত আর তা দিয়েই সংসার চলত।
 
অতি সম্প্রতি ইমাসের অবস্থার কিছুটা হলেও পরিবর্তন ঘটেছে। একটি ফাউন্ডেশনের তার সকল সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছে। ওদের ওখানেই থাকে এতিম শিশুগুলো। প্রত্যেকেই স্কুলে পড়াশোনা করে ফাউন্ডেশনের খরচে। দ্বিতীয় বিবাহের পর ইমাস ভাগাড় থেকে রিসাইক্লিংয়ের জিনিসপত্র সংগ্রহের কাজ পেয়েছেন, যা থেকে তিনি প্রতি মাসে ৪৯ মার্কিন ডলার থেকে ৭৪ মার্কিন ডলার আয় করেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ইমাসের এ আয়ের স্তরকে ‘প্রায়-দরিদ্র’ বলা যায়। তিনি মাসে দু’বার ছেলেমেয়েদের দেখেও আসতে পারেন। তার মতো দশ কোটি ইন্দোনেশীয় দিন পার করে মাত্র ১ থেকে ২ ডলার খরচ করে। এ অবস্থায় নতুন প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ঘোষণা দিয়েছেন, তেলের ওপর দেওয়া ভর্তুতি ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেবেন। বিশ্লেকরা বলছেন, এতে করে দরিদ্র লোকজনের অবস্থার আরো অবনতি ঘটবে। কিন্তু সরকারের যুক্তি হচ্ছে, তেল বাবদ দেওয়া ভর্তুকির সুবিধাটা আসলে ভোগ করে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন। ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়াতে যে অর্থ বাঁচবে  তা খরচ করা হবে বন্দর ও রাস্তাঘাট নির্মাণ ও বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজে।
 
জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, এ কথা সত্য। কিন্তু এটি মোকাবিলার চেষ্টা করছে ভিন্নভাবে। সরকার গত মাসে তিনটি সামাজিক নিরাপত্তা কার্ডযুক্ত ওয়েলফেয়ার ফ্যামিলি সেভিংস প্রোগ্রাম (পিএসকেএস) চালু করেছে। আর এ তিনটি কার্ড হলো দ্য প্রোসপারাস ফ্যামিলি কার্ড (কেকেএস), দ্য হেলদি ইন্দোনেশিয়া কার্ড ও দ্য স্মার্ট ইন্দোনেশিয়া কার্ড (কেআইপি)। গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত লোকজনসহ ১৫.৫ মিলিয়ন দরিদ্র ইন্দোনেশীয়কে প্রথম দফায় এসব কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক এরই মধ্যে পিএসকেএস-কে আখ্যা দিয়েছে আজকের বিশ্বের সর্ববৃহত্ সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার প্রচেষ্টা হিসেবে। পিএসকেএস প্রকল্পের আওতার তিনটি কার্ডই প্রিএকটিভেটেড মোবাইল ফোন সিম কার্ড এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক মান্দিরিতে থাকা সঞ্চয়ী হিসাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকার আশা করছে, এ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতি মাসে ১৫.৫ মিলিয়ন দরিদ্র ও গৃহহীন পরিবারগুলোর একজন সদস্যের মোবাইলে ১৬.৫ মার্কিন ডলার ট্রান্সফার করা হবে। যা দিয়ে কমানো সম্ভব হবে তেল বাবদ ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়ার ব্যথা। সুবিধাভোগী সুনির্দিষ্ট ব্যাংক ও পোস্ট অফিস থেকে এ অর্থ ক্যাশ করে নিতে পারবেন। সফল হলে এটি হবে বিশ্বের সর্ববৃহত্ সরকার অর্থায়িত ক্যাশ ট্রান্সফার কর্মসূচি।
 
দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার। সেই সঙ্গে ২০১৯ নাগাদ সবার জন্য বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চায়। এখন পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া জিডিপির মাত্র ১.২ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে, যা কিনা পৃথিবীর পঞ্চম সর্বনিম্ন।  বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি জনসচেতনতার অভাবে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ইন্দোনেশিয়ায় স্কুলে যাওয়ার বয়সী ৮.৫ মিলিয়ন শিশু স্কুল পদ্ধতির বাইরে রয়েছে। সেজন্য ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে। ইমাস যেমন নতুন কর্মসূচির ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কিছুই জানেন না। ইন্দোনেশিয়ার তার মতো অনিবন্ধিত লোকের সংখ্যা অসংখ্য।, যারা নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতে পারছে না। অথচ মোবাইল ফোন প্রযুক্তিতে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া অন্তর্ভুক্তির কোনো সুযোগ নেই।
 
ইন্দোনেশিয়ায় জনকল্যাণমূলক ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে এমন এক সময়ে যখন ধনী ও গরিবের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। ২০০১ থেকে এখন পর্যন্ত ২০ মিলিয়নেরও বেশি নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে এবং গড় বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশেরও উপরে। সরকারের এখনকার লক্ষ্য চরম দারিদ্র্য দূর করে ধনী ও গরিবের ব্যবধান কমানো। ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের ২০ শতাংশ ধনী লোকের ভোগ বেড়েছিল ৫.৯ শতাংশ হারে। কিন্তু দরিদ্র ৪০ শতাংশের ভোগ বেড়েছিল। ১৯৯০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি ইন্দোনেশীয় দিন পার করত ১.২৫ মার্কিন ডলারেরও কম খরচ করে। দেশটিতে শিশু অপুষ্টির হার তাদের চেয়ে দরিদ্র দেশ ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি। ইন্দোনেশিয়ার ৩৭ শতাংশ শিশু কম ওজনের সমস্যায় ভুগছে। যে কারণে ঠিকমত ঘটছে না তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে এসবের উন্নতি ঘটবে নিঃসন্দেহে। বলসা ফ্যামিলিয়া কর্মসূচির মাধ্যমে যা করে দেখিয়েছে ব্রাজিল। সেখানে নাটকীয়ভাবে কমে আসছে দরিদ্র লোকের সংখ্যা। ব্রাজিলের মতোই এশীয় অঞ্চলের দৃষ্টান্ত হতে চায় ইন্দোনেশিয়া।
 
—নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে