সিয়াম বিন আহমাদ
আজ সমাজের প্রতিটি সচেতন, বিবেকবান, জ্ঞানী মানুষও যেন পাগল। আমরা শুধু শেষ ঘটনাটাই মনে রাখি। এইত গেল মাসে চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথাই বলি, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরেও রাসায়নিক গুদাম আর অনিরাপদ গ্যাস সিলিন্ডারের বিষয়ে আজো কেন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো না? এত বড় একটা ঘটনার পরেও সরকার কি অগ্নিকাণ্ড থেকে মানুষকে বাঁচাতে অর্থবহ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? তবে আশার কথা বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে কাজ করছে।
গ্রাম কিংবা শহর হোক আমরা সাধারণ মানুষের বিপদে অন্য কোনো বাহিনীর থেকে বেশি আগুয়ান দেখি ফায়ার সার্ভিসকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেদিন অবধিও সরকার এদের সক্ষমতা বা সামর্থ্য বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এবার আসি নুসরাতের কথায়, ঘটনা কারোরই অজানা নয়। অজানা শুধু অদ্যাবধি আমাদের নিয়মরীতি কতটা হেরফের হয়েছে এটা জানার? কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। আর এমন সাধারণ বিষয়ের জন্য মানববন্ধন, আন্দোলন বা প্লেকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়াতে হয় না। এর পরেও যখন এমন একটা বিষয় নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, প্লেকার্ড হাতে অপরাধীর শাস্তির জন্য বিচার চাইতে হয় তখন একটু হলেও উপলব্ধি করা যায় আমাদের নিয়মরীতির উপর আমরা কতটা আস্থাশীল?
আইনের অবহেলার কথা আর কী বলব। পুলিশের বিরুদ্ধে সংবেদনশীল আচরণ না করার অভিযোগ অহরহ। সব থানায় ২৪ ঘণ্টার জন্য নারী কর্মকর্তা নেই। ধর্ষণের শিকার একজন নারীকে প্রথমেই ডিউটি অফিসারের মুখোমুখি হতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওই ডিউটি অফিসার হন পুরুষ। পুলিশ প্রায়ই আক্রান্ত নারীর উদ্দেশে ‘২৯০’ কথাটা উচ্চারণ করেন। সাধারণত অবৈধ যৌনকর্মের জন্য যারা গ্রেফতার হন, তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ২৯০ ধারায় মামলা করে থাকে পুলিশ। ওদিকে ডাক্তারি রিপোর্টও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। এসব করে করেই তনু, আয়েশা, নুসরাতের মতো বেদনাবিধুর কোর্ট ফাইলেও ধূলো জমে যায়।
আমরা একটু বহির্বিশ্বের দিকে তাকাই, ওই দেশগুলোতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কেউ বিশ্ববিখ্যাত হয়, কেউ নোবেল পায় আবার কেউবা জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হয়। আর আমরা এমনই একটা কপাল পোড়া দেশে বাস করি, যেই দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে আগুনে পুড়ে মরতে হয়।
এই সোনার দেশে নারী নির্যাতন মামলার দিকে তাকালে মনে হয় না এটা গুরুতর কোনো অপরাধ! কেননা মানুষ অপরাধ তো তখনই মনে করবে যখন এর শাস্তি হবে। তাহলে একটু দেখেই আসা যাক, নারী নির্যাতন মামলার হালচাল। একটা জাতীয় দৈনিকে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আসা সাত হাজার ৮৬৪টি মামলার মধ্যে তখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল চার হাজার ২৭৭টি মামলা আর তার মাত্র ১১০টি মামলায় সাজা হয়েছিল। অর্থাত্ বিচার হয়েছিল তিন শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খালাস হয়ে গেছে।
এভাবে দিন যত গড়াচ্ছে তথ্যগুলো ততই ভয়ঙ্কর হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদেরই মা-বোন। আমাদের কি মনে আছে ২০১৬ সালের সেই তনুর কথা? এইতো সেদিনের আয়েশার কথাই তো, অনেকের মনে নেই। এভাবেই কাল নয়তো পরশু আমরা এই নুসরাতকেও ভুলে যাব। আবার অপেক্ষায় থাকব অন্য কোনো নতুন নুসরাতের ঘটনা মিডিয়া-পত্রিকার রেডলাইন-হেডলাইন হলো কি না? আমরা কি শুধু এই দেখে যাব? আর কত...!
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া