'সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন'

এসওএস আন্তর্জাতিক শিশু পল্লী বাংলাদেশ ও ইত্তেফাক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, এসওএস শিশুপল্লীর কার্যক্রম সুবিধাবঞ্চিত ও পরিবার বিচ্ছিন্ন শিশুদের সুন্দর জীবন গড়তে বিশ্বজুড়েই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একে মডেল ধরে সারাদেশেই শিশুপল্লী গড়ে তোলা হলে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া শিশুরা আলোকিত জীবনের দেখা পেতে পারে। তাদের এই দৃষ্টান্তমূলক কাজের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিও জানান কেউ কেউ।
 
গতকাল রবিবার রাজধানীর কাওরানবাজারে ইত্তেফাক কার্যালয়ে মজিদা বেগম মিলনায়তনে ‘শিশু সুরক্ষা ও উন্নয়ন:এসওএস শিশু পল্লীর ভূমিকা’ শীর্ষক এই আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য জেবুন্নেসা আফরোজ ও মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম। এতে সূচনা বক্তব্য রাখেন এসওএস আন্তর্জাতিক শিশু পল্লী বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর গোলাম আহমেদ ইসহাক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসওএস আন্তর্জাতিক শিশু পল্লী বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিষয়ক ন্যাশনাল ফোকাল পারসন চায়না রানী সাহা। সভাপতিত্ব করেন ইত্তেফাকের সিটি এডিটর আবুল খায়ের।
 
প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শরণার্থী ও পরিবার হারানো শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য হারম্যান মেইনার ‘এসওএস শিশু পল্লী’র ধারণাটি চালু করেন। যা পরিবারের বিকল্প হয়ে পরিবার ও মা-বাবা হারানো শিশুদের ভবিষ্যত্ জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। ১৯৭২ সাল থেকে দেশে কাজ করে যাচ্ছে ‘এসওএস শিশু পল্লী’।
 
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশ খুব একটা পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে আমাদের অগ্রগতি ভালো। সারাদেশে শিশু আদালত বসানো হচ্ছে। দেশের প্রতিটি বিভাগে ‘শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শেখ রাসেল দুস্থ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। বেসরকারি এতিমখানাগুলোকেও সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার উদ্যোগ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু আইন করেছিলেন। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনটি সংশোধন করেন। এখন এটি আরো সংশোধন হয়ে সংসদে গেছে। আশা করি আগামী অধিবেশনেই আইনটি পাস হবে।
 
সংসদ সদস্য জেবুন্নেসা আফরোজ বলেন, এবারের বাজেটে শিশু সুরক্ষা ও উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে সরকার। শিশুদের সুরক্ষায় গর্ভবতী অবস্থা থেকে মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে সবকিছু সরকার একা করতে পারবে না। জনগণকেও সচেতন হতে হবে।
 
নাছিমা বেগম বলেন, মায়েরা যাতে কর্মজীবী হতে পারে সেজন্য ডে কেয়ার সেন্টার চালু করতে আইন প্রণয়ন করছে সরকার। অবহেলিত শিশুদের উন্নয়ন ও সুরক্ষার বিষয়টি শুধু মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, এর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।
 
স্বাগত বক্তব্যে শিশুপল্লীর ন্যাশনাল ডিরেক্টর গোলাম আহমেদ ইসহাক বলেন, শিশুদের শিক্ষা, বাসস্থান সুবিধা দিয়ে উন্নত জীবনবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে এসওএস শিশুপল্লী। বর্তমানে দেশের ছয়টি স্থানে এসওএস শিশুপল্লী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে দেশের সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা যায়নি। তবে শিশুপল্লীর এ মডেলটি অনুসরণ করে দেশজুড়ে শিশুপল্লী গড়ে তুললে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
 
মূল প্রবন্ধে চায়না রানী সাহা বলেন, সরকারের নানামুখী উদ্যোগের পরেও শিশু অধিকার লংঘন ও শিশু নির্যাতন বাড়ছে। এসওএস শিশুপল্লী বাংলাদেশের শিশু যত্ন মডেলকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর আওতায় সরকারের সকল শিশুসদন এবং বেবিহোমগুলো পর্যায়ক্রমে শিশুপল্লীর আদলে পরিচালিত হবে। তারপরেও ‘শিশু অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করে সব মন্ত্রণালয়ের শিশু সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডকে সমন্বয়ের ওপর তাগিদ দেন তিনি।
 
আলোচনায় অংশ নিয়ে ডিআইজি ব্যারিস্টার মাহবুব হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সব থানায় শিশুবান্ধব অফিসার রয়েছে। কোনো থানায় গিয়ে যদি শিশুবান্ধব অফিসার পাওয়া না যায় সেটা আমাদের জানালে আমরা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।
 
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক ছড়াকার আনজীর লিটন বলেন, শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে দেশজুড়ে শিশু একাডেমি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই শিশু সুরক্ষা উন্নয়নে কোনো কাজ হচ্ছে না- এমন ধারণা থেকে বের হয়ে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
 
আবুল খায়ের বলেন, দেশ উন্নত হচ্ছে। এর সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। এসবের মাঝেই শিশুদের উন্নয়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও দেশের জনগণকে একসঙ্গে সমিন্বতভাবে এ সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করতে হবে।
 
আলোচনায় আরো অংশ নেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ এস এম আতীকুর রহমান, শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান ড. খাজা শামসুল হুদা, ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহেরীন, সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাপক মো. একরামুল কবীর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী আবদুল্লা আল মামুন, এসওএস আন্তর্জাতিক শিশু পল্লী বাংলাদেশের জাতীয় উপ-পরিচালক ডা. মো. এনামুল হক, ব্যারিস্টার মিতি সানজানা, কবি ও গণমাধ্যম কর্মী তাহমিনা শিল্পী, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সম্পা দাস ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপ-পরিচালক এম রবিউল ইসলাম। বৈঠক সঞ্চালনা করেন ইত্তেফাকের প্রতিবেদক আসিফুর রহমান সাগর।
 
ইত্তেফাক/নুহু